ঘোড়ার গাড়িতেই সচল তিস্তার চর
- আপডেট সময় : ০৭:২০:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ জীবনের বহু ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামবাংলার পথে–প্রান্তরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়েই গেছে। তবে ব্যতিক্রম রয়ে গেছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল।
বাংলার গ্রামীণ জনপদে একসময় ঘোড়া দিয়ে টানা গাড়ি ছিল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান বাহন। জানা যায়, ১৮৩০ সালের দিকে বাংলার মেঠোপথে এই গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। কিছু সূত্রে বলা হয়, ১৮৫৬ সালে শাঁখারীবাজারে আর্মেনীয় বণিকদের প্রতিষ্ঠান ‘সিরকো অ্যান্ড সন্স’ বাণিজ্যিক কাজে প্রথম ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার শুরু করে। তখন এটি জমিদারি বাহনের পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও ব্যবসায়িক মাল পরিবহনের জন্যও ব্যবহৃত হতো। নবাবি আমল পেরিয়ে, গ্রামবাংলার মেঠোপথ থেকে শহরের অলিগলি—প্রায় সবখানেই টগবগ শব্দ তুলে ছুটে চলত ঘোড়ার গাড়ি।
ঘোড়ার গাড়ি কেবল বাহন ছিল না, বরং গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফসল তোলা, বাজারে পৌঁছে দেওয়া বা যাত্রী পরিবহন—সবকিছুকেই সহজতর করেছিল এটি। এক সময় ঘোড়ার গাড়ি ছিল মর্যাদা ও যোগাযোগের প্রতীক। গ্রামের মানুষদের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এই ঐতিহ্যবাহী বাহন।
তবে আধুনিক যানবাহনের দৌড়ে এখন ঘোড়ার গাড়ি হারিয়ে যেতে বসেছে। শহরে যেমন দেখা যায় না, তেমনি গ্রামবাংলার অনেক এলাকায়ও ঘোড়ার গাড়ির সংখ্যা কমে এসেছে। ঘোড়ার গাড়ির একটি বিশেষ সংস্করণ হলো টমটম। এটি বাংলাদেশের, বিশেষ করে পুরান ঢাকার, ঐতিহ্যবাহী যাত্রীবাহী বাহন। টমটম সাধারণত এক বা দুই ঘোড়া দ্বারা টানা হয় এবং ১৮৩০-এর দশকে ঢাকায় প্রথম চালু হয়েছিল। কয়েক বছর আগেও সদরঘাট-গুলিস্তান রুটে চলত বেশ কয়েকটি টমটম। বর্তমানে অনেক এলাকা, বিশেষ করে শহরের রাস্তায় টমটম চলাচল প্রায় বন্ধ।
ঘোড়ার গাড়ি হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি বাহনের অবসান নয়; বরং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জনপদের ঐতিহ্যের এক দীর্ঘ ইতিহাসও হারিয়ে যাচ্ছে। দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই জীবন্ত অধ্যায় আজ স্মৃতির পাতায় স্থান পাচ্ছে। তবে উত্তরের জেলা রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদী বেষ্টিত চরাঞ্চলের একমাত্র ভরসা টগবগে শব্দ তুলে ছুটে চলা ঘোড়ার গাড়ি। যা সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে টিকে রাখার এক জীবন্ত সাক্ষ্য।
উঁচু–নিচু বালুময় আঁকাবাঁকা পথে আজও চরবাসীর প্রধান ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। যেখানে আধুনিক যান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল অসম্ভব, সেখানে নির্ভরযোগ্য বাহন হিসেবে টিকে আছে এই ঐতিহ্যবাহী যান। বর্ষাকালে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে ঘোড়ার গাড়িই চরবাসীর যাতায়াত ও জীবিকার অন্যতম অবলম্বন।
তিস্তার পানি কমে যাওয়ায় নদীর বুকে গড়ে উঠেছে ছোট–বড় অসংখ্য চর। এসব চরের বালুর রাস্তা ধরে এখনো টগবগ শব্দ তুলে ছুটে চলে ঘোড়ার গাড়ি। সরেজমিনে উপজেলার নোহালী, লক্ষ্মীটারি, গজঘণ্টা ও মর্নেয়া ইউনিয়নের তিস্তা অববাহিকায় গড়ে ওঠা চরগুলো ঘুরে দেখা গেছে—সেখানে এখনো চলাচলের প্রধান ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই চরাঞ্চলে এটিই একমাত্র কার্যকর যানবাহন। বালুময় চরভূমিতে অনায়াসে চলতে পারায় ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার আজও ব্যাপক। চরাঞ্চলে উৎপাদিত আলু, ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়াসহ নানা ফসল প্রথমে তোলা হয় ঘোড়ার গাড়িতে। এরপর কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ বালুর পথ পেরিয়ে সেগুলো পৌঁছে যায় হাট–বাজারে। চরবাসীর কাছে ঘোড়ার গাড়ি কেবল একটি বাহন নয়, বরং জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঘোড়ার গাড়িচালক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আমরা চরের কৃষক মানুষ। বহু বছর ধরেই ঘোড়ার গাড়ি চালাই। ফসল ঘরে তোলা থেকে বাজারে নেওয়া—সবই এই গাড়িতে করতে হয়।’
আরেক চালক জসীম উদ্দীন জানান, ‘ফসল তোলা হোক বা হাটে নেওয়া—ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া এখানে কোনো উপায় নেই।’
ছালাপাক গ্রামের কৃষক আনিছার বলেন, ‘বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরে জমি। ঘোড়ার গাড়ি না পেলে মাথায় বা কাঁধে করেই ফসল আনতে হয়।’
একই গ্রামের ঘোড়ার গাড়িচালক নাজমুল ও কালাম জানান, তারা প্রায় এক যুগ ধরে এই পেশায় যুক্ত। প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা আয় হয়। এর মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হয় ঘোড়ার খাবারে। বাকি অর্থ দিয়েই কোনোমতে চলে তাদের সংসার।
লক্ষীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘নদীতীরবর্তী বালুময় রাস্তায় চলাচল বা পণ্য পরিবহনের জন্য এখনো একমাত্র কার্যকর বাহন হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি।’
তিস্তার চরে সূর্য ডুবে গেলেও বালুর পথ ধরে ছুটে চলে ঘোড়ার গাড়ি। আধুনিকতার জোয়ারে যখন গ্রামীণ ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ঘোড়ার গাড়িগুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে তিস্তার বুকজুড়ে।


















