ঢাকা ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমেরিকান ড্রিম নিয়ে কিছু ভাবনা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৩৮:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সম্প্রতি সুদর্শনা বোরদোলাইয়ের ‘মাইগ্রেশন ও হেলথ’ শিরোনামের একটি গবেষণা প্রবন্ধ পড়েছি। সেখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। কীভাবে একজন সুস্থ মানুষ উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় একটি উন্নত দেশে অভিবাসনের পর ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর পেছনে শুধু ব্যক্তিগত জীবনযাপন বা খাদ্যাভ্যাস দায়ী নয়; একই সঙ্গে কাজের পরিবেশ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, স্বাস্থ্যসেবায় সীমাবদ্ধতাসহ নানা কাঠামোগত সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

.

আমরা সাধারণত মনে করি, উন্নত দেশ মানেই উন্নত জীবন, ভালো খাবার, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, নিরাপদ আবাসন এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়। একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হলেই যে সেখানে বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর গত কয়েক মাসে আমার নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে বিষয়টি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। আমরা সবাই American Dream কিংবা সুযোগের সুবর্ণভূমির গল্প শুনেছি। কিন্তু এই স্বপ্নের আড়ালে মানুষের শারীরিক সুস্থতা, আবেগ, মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক সম্পর্ক কীভাবে ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ে, সেই আলোচনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়। আমরা বাইরে যেটা দেখি, সেটা হলো মানুষ যা দেখাতে চায়, সেটাই দেখায়।

.

একটি সাধারণ উদাহরণ দিই প্রতিদিনের খাবার নিয়ে। বাংলাদেশে আমরা যে পরিমাণ তাজা শাকসবজি ও মাছ খেতে পারি, যুক্তরাষ্ট্র এসে অনেকের পক্ষে তার দশ ভাগের এক ভাগও নিয়মিত খাওয়া কঠিন। এখানে একটি ফুলকপি কিংবা বাঁধাকপির দাম প্রায় ৫ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০০ টাকার কাছাকাছি। অথচ বাংলাদেশের অনেক মৌসুমি বাজারে এই টাকায় কয়েক কেজি, কখনো ১০ কেজি পর্যন্ত ফুলকপি কেনা সম্ভব। শুধু ফুলকপি নয়, অনেক ধরনের তাজা শাকসবজি ও মাছের দামই তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে কিছু ধরনের মাংস অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং সহজলভ্য। ফলে সীমিত আয়ের শিক্ষার্থী কিংবা অভিবাসী শ্রমিকদের খাদ্যতালিকা অনেক সময় পুষ্টির চেয়ে অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করতে হয়। মাংস খাওয়া সমস্যা নয়; সমস্যা হলো সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ একদমই কমে আসে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সময়ের সংকট। একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট, গবেষণা, চাকরি কিংবা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের দায়িত্ব সামলাতে হয়। এত কিছুর মধ্যে প্রতিদিন বাজার করা কিংবা নতুন করে রান্না করার সুযোগ থাকে না। অনেক সময় একদিন রান্না করে চার-পাঁচ দিন সেই খাবার খেতে হয়। খাবার তখন আর স্বাদ, সংস্কৃতি কিংবা আনন্দের বিষয় থাকে না; হয়ে ওঠে কোনোভাবে ক্ষুধা নিবারণের একটি দৈনন্দিন কাজ। তার ওপর যদি নিজের গাড়ি না থাকে, তাহলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মতো বাসা থেকে বের হলেই বাজার, মাছের দোকান কিংবা সবজির দোকান পাওয়া যায় না। অনেক এলাকায় গ্রোসারি স্টোরগুলো এত দূরে যে ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া সেখানে যাওয়াই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আপনি কী খাবেন, কতটা স্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন, এমনকি কখন বাজার করতে পারবেন—এসবও অনেকাংশে নির্ধারিত হয় নগর–পরিকল্পনা, পরিবহনব্যবস্থা এবং আপনার অর্থনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে।

.

এখানেই আমার কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ার আগেই তার চারপাশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ধীরে ধীরে তার সুস্থ থাকার সুযোগগুলো সংকুচিত করতে থাকে। এরপর আসে স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাব্যবস্থা প্রযুক্তি, গবেষণা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার দিক থেকে অত্যন্ত উন্নত। কিন্তু উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা আর সেই চিকিৎসায় সবার সমান প্রবেশাধিকার থাকা, এক বিষয় নয়। স্বাস্থ্যবিমা থাকার পরও ডিডাক্টিবল, কো-পে, নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা এবং বিমার আওতাবহির্ভূত চিকিৎসার ব্যয় একজন সাধারণ শিক্ষার্থী কিংবা নিম্ন আয়ের অভিবাসীর জন্য বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেক দুশ্চিন্তা শুরু হয়। চিকিৎসার খরচ কীভাবে মেটাবেন? বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসংখ্য সীমাবদ্ধতা আছে, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম খরচে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া কিংবা কিছু সাধারণ চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যে সুযোগ রয়েছে, সেটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য আশীর্বাদ। তবে আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় শুধু খাবার কিংবা চিকিৎসা নয়; মানুষের মানসিক ও ইমোশনাল জীবনের ক্রমাগত সংকোচন।

যুক্তরাষ্ট্রে জীবন যেন একটি রোবোটিকস প্রতিযোগিতা। পড়াশোনা করতে হবে, কাজ করতে হবে, বিল দিতে হবে, সময়মতো সবকিছু শেষ করতে হবে, আবার পরদিন একই চক্রে ফিরে যেতে হবে। এই ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য সময়, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রকৃতির সান্নিধ্য কিংবা নিছক আনন্দের মুহূর্তগুলো ক্রমেই দুর্লভ হয়ে ওঠে। অথচ মানুষের সুস্থতা কেবল রোগমুক্ত থাকা না। সুস্থতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাবারের স্বাদ, পরিচিত মানুষের সান্নিধ্য, সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিচয়, মানসিক প্রশান্তি এবং নিজের জীবনের ওপর কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ থাকার অনুভূতি।

.

আমার কাছে তাই আমেরিকান ড্রিম অনেক সময় একটি রোবোটিক প্রকল্পের মতো মনে হয়, যেখানে মানুষকে প্রতিনিয়ত আরও বেশি উৎপাদনশীল, আরও বেশি প্রতিযোগিতামুখী এবং আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল হতে শেখানো হয়; কিন্তু সেই মানুষ আদৌ কতটা ভালো আছে, কতটা শান্তিতে আছে, কিংবা কতটা সুস্থ আছে, সেই প্রশ্ন আড়ালেই থেকে যায়। অবশ্যই আমেরিকায় সুযোগ আছে, উন্নত অবকাঠামো আছে, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার অসাধারণ পরিবেশ আছে। অনেক মানুষ এখানে এসে সত্যিকার অর্থেই জীবনের পরিবর্তন করেছেন। আমার এই উপলব্ধি সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না। প্রশ্ন হলো, এই সুযোগ অর্জন করতে গিয়ে একজন মানুষকে তার জীবনের কতটা মূল্য দিতে হয়? আর সেই মূল্য কি সবার জন্য সমান?

বাংলাদেশের কথা ভাবলে বিষয়টি আরও বেশি অনুভব করি। আমাদের দেশের নদী, খাল, বিল, সবুজ প্রকৃতি, মৌসুমি শাকসবজি, তাজা মাছ, পরিচিত সামাজিক পরিবেশ এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মতো বিষয়ের মূল্য আমরা অনেক সময় দেশে থাকতে বুঝতে পারি না। এগুলো কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নয়; এগুলো মানুষের সুস্থ ও অর্থবহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দুঃখজনকভাবে, আমাদের রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, বৈষম্য, পরিবেশ ধ্বংস এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এই অসাধারণ সম্ভাবনাময় দেশটিকে বসবাসের জন্য ক্রমেই কঠিন করে তুলেছে। অথচ সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর জনসেবার নিশ্চয়তা থাকলে বাংলাদেশে বসবাস করা অনেক মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থেই আশীর্বাদ হতে পারত।

.

বিদেশে এসে আমার একটি উপলব্ধি আরও দৃঢ় হয়েছে। উন্নয়ন মানে শুধু উঁচু ভবন, বড় রাস্তা, বেশি আয় কিংবা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়। উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি হওয়া উচিত মানুষ কতটা সুস্থ, কতটা নিরাপদ, কতটা মানসিক প্রশান্তিতে এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছে। যে উন্নয়ন মানুষের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। যদিও তার শারীরিক সুস্থতা, আবেগ, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক শান্তিকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে, সেই উন্নয়নকে উন্নয়ন বলা যায় না।

*লেখক: আমিনুর রহমান, গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী, জিওগ্রাফি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

.

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

আমেরিকান ড্রিম নিয়ে কিছু ভাবনা

আপডেট সময় : ০৮:৩৮:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

সম্প্রতি সুদর্শনা বোরদোলাইয়ের ‘মাইগ্রেশন ও হেলথ’ শিরোনামের একটি গবেষণা প্রবন্ধ পড়েছি। সেখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। কীভাবে একজন সুস্থ মানুষ উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় একটি উন্নত দেশে অভিবাসনের পর ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর পেছনে শুধু ব্যক্তিগত জীবনযাপন বা খাদ্যাভ্যাস দায়ী নয়; একই সঙ্গে কাজের পরিবেশ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, স্বাস্থ্যসেবায় সীমাবদ্ধতাসহ নানা কাঠামোগত সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

.

আমরা সাধারণত মনে করি, উন্নত দেশ মানেই উন্নত জীবন, ভালো খাবার, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, নিরাপদ আবাসন এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়। একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হলেই যে সেখানে বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর গত কয়েক মাসে আমার নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে বিষয়টি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। আমরা সবাই American Dream কিংবা সুযোগের সুবর্ণভূমির গল্প শুনেছি। কিন্তু এই স্বপ্নের আড়ালে মানুষের শারীরিক সুস্থতা, আবেগ, মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক সম্পর্ক কীভাবে ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ে, সেই আলোচনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়। আমরা বাইরে যেটা দেখি, সেটা হলো মানুষ যা দেখাতে চায়, সেটাই দেখায়।

.

একটি সাধারণ উদাহরণ দিই প্রতিদিনের খাবার নিয়ে। বাংলাদেশে আমরা যে পরিমাণ তাজা শাকসবজি ও মাছ খেতে পারি, যুক্তরাষ্ট্র এসে অনেকের পক্ষে তার দশ ভাগের এক ভাগও নিয়মিত খাওয়া কঠিন। এখানে একটি ফুলকপি কিংবা বাঁধাকপির দাম প্রায় ৫ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০০ টাকার কাছাকাছি। অথচ বাংলাদেশের অনেক মৌসুমি বাজারে এই টাকায় কয়েক কেজি, কখনো ১০ কেজি পর্যন্ত ফুলকপি কেনা সম্ভব। শুধু ফুলকপি নয়, অনেক ধরনের তাজা শাকসবজি ও মাছের দামই তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে কিছু ধরনের মাংস অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং সহজলভ্য। ফলে সীমিত আয়ের শিক্ষার্থী কিংবা অভিবাসী শ্রমিকদের খাদ্যতালিকা অনেক সময় পুষ্টির চেয়ে অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করতে হয়। মাংস খাওয়া সমস্যা নয়; সমস্যা হলো সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ একদমই কমে আসে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সময়ের সংকট। একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট, গবেষণা, চাকরি কিংবা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের দায়িত্ব সামলাতে হয়। এত কিছুর মধ্যে প্রতিদিন বাজার করা কিংবা নতুন করে রান্না করার সুযোগ থাকে না। অনেক সময় একদিন রান্না করে চার-পাঁচ দিন সেই খাবার খেতে হয়। খাবার তখন আর স্বাদ, সংস্কৃতি কিংবা আনন্দের বিষয় থাকে না; হয়ে ওঠে কোনোভাবে ক্ষুধা নিবারণের একটি দৈনন্দিন কাজ। তার ওপর যদি নিজের গাড়ি না থাকে, তাহলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মতো বাসা থেকে বের হলেই বাজার, মাছের দোকান কিংবা সবজির দোকান পাওয়া যায় না। অনেক এলাকায় গ্রোসারি স্টোরগুলো এত দূরে যে ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া সেখানে যাওয়াই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আপনি কী খাবেন, কতটা স্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন, এমনকি কখন বাজার করতে পারবেন—এসবও অনেকাংশে নির্ধারিত হয় নগর–পরিকল্পনা, পরিবহনব্যবস্থা এবং আপনার অর্থনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে।

.

এখানেই আমার কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ার আগেই তার চারপাশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ধীরে ধীরে তার সুস্থ থাকার সুযোগগুলো সংকুচিত করতে থাকে। এরপর আসে স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাব্যবস্থা প্রযুক্তি, গবেষণা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার দিক থেকে অত্যন্ত উন্নত। কিন্তু উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা আর সেই চিকিৎসায় সবার সমান প্রবেশাধিকার থাকা, এক বিষয় নয়। স্বাস্থ্যবিমা থাকার পরও ডিডাক্টিবল, কো-পে, নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা এবং বিমার আওতাবহির্ভূত চিকিৎসার ব্যয় একজন সাধারণ শিক্ষার্থী কিংবা নিম্ন আয়ের অভিবাসীর জন্য বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেক দুশ্চিন্তা শুরু হয়। চিকিৎসার খরচ কীভাবে মেটাবেন? বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসংখ্য সীমাবদ্ধতা আছে, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম খরচে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া কিংবা কিছু সাধারণ চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যে সুযোগ রয়েছে, সেটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য আশীর্বাদ। তবে আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় শুধু খাবার কিংবা চিকিৎসা নয়; মানুষের মানসিক ও ইমোশনাল জীবনের ক্রমাগত সংকোচন।

যুক্তরাষ্ট্রে জীবন যেন একটি রোবোটিকস প্রতিযোগিতা। পড়াশোনা করতে হবে, কাজ করতে হবে, বিল দিতে হবে, সময়মতো সবকিছু শেষ করতে হবে, আবার পরদিন একই চক্রে ফিরে যেতে হবে। এই ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য সময়, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রকৃতির সান্নিধ্য কিংবা নিছক আনন্দের মুহূর্তগুলো ক্রমেই দুর্লভ হয়ে ওঠে। অথচ মানুষের সুস্থতা কেবল রোগমুক্ত থাকা না। সুস্থতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাবারের স্বাদ, পরিচিত মানুষের সান্নিধ্য, সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিচয়, মানসিক প্রশান্তি এবং নিজের জীবনের ওপর কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ থাকার অনুভূতি।

.

আমার কাছে তাই আমেরিকান ড্রিম অনেক সময় একটি রোবোটিক প্রকল্পের মতো মনে হয়, যেখানে মানুষকে প্রতিনিয়ত আরও বেশি উৎপাদনশীল, আরও বেশি প্রতিযোগিতামুখী এবং আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল হতে শেখানো হয়; কিন্তু সেই মানুষ আদৌ কতটা ভালো আছে, কতটা শান্তিতে আছে, কিংবা কতটা সুস্থ আছে, সেই প্রশ্ন আড়ালেই থেকে যায়। অবশ্যই আমেরিকায় সুযোগ আছে, উন্নত অবকাঠামো আছে, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার অসাধারণ পরিবেশ আছে। অনেক মানুষ এখানে এসে সত্যিকার অর্থেই জীবনের পরিবর্তন করেছেন। আমার এই উপলব্ধি সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না। প্রশ্ন হলো, এই সুযোগ অর্জন করতে গিয়ে একজন মানুষকে তার জীবনের কতটা মূল্য দিতে হয়? আর সেই মূল্য কি সবার জন্য সমান?

বাংলাদেশের কথা ভাবলে বিষয়টি আরও বেশি অনুভব করি। আমাদের দেশের নদী, খাল, বিল, সবুজ প্রকৃতি, মৌসুমি শাকসবজি, তাজা মাছ, পরিচিত সামাজিক পরিবেশ এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মতো বিষয়ের মূল্য আমরা অনেক সময় দেশে থাকতে বুঝতে পারি না। এগুলো কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নয়; এগুলো মানুষের সুস্থ ও অর্থবহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দুঃখজনকভাবে, আমাদের রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, বৈষম্য, পরিবেশ ধ্বংস এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এই অসাধারণ সম্ভাবনাময় দেশটিকে বসবাসের জন্য ক্রমেই কঠিন করে তুলেছে। অথচ সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর জনসেবার নিশ্চয়তা থাকলে বাংলাদেশে বসবাস করা অনেক মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থেই আশীর্বাদ হতে পারত।

.

বিদেশে এসে আমার একটি উপলব্ধি আরও দৃঢ় হয়েছে। উন্নয়ন মানে শুধু উঁচু ভবন, বড় রাস্তা, বেশি আয় কিংবা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়। উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি হওয়া উচিত মানুষ কতটা সুস্থ, কতটা নিরাপদ, কতটা মানসিক প্রশান্তিতে এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছে। যে উন্নয়ন মানুষের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। যদিও তার শারীরিক সুস্থতা, আবেগ, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক শান্তিকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে, সেই উন্নয়নকে উন্নয়ন বলা যায় না।

*লেখক: আমিনুর রহমান, গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী, জিওগ্রাফি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

.

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com