ঢাকা ১০:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসাতে যুক্তরাষ্ট্রের এত তাড়া কেন, প্রতিযোগিতায় রাশিয়া–চীনও

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৩৬:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানো হলে সেখানে ঘাঁটি নির্মাণ ও খনিজ উত্তোলনে বিপ্লব ঘটতে পারে। তবে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।

.

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ঘোষণা দেয়, ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করা হবে। অন্যদিকে রাশিয়া চীনের সঙ্গে মিলে ২০৩৬ সালের মধ্যে একই লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য মহাকাশ অনুসন্ধান আরও এগিয়ে নেওয়া।

এ ঘোষণার পর মহাকাশে অস্ত্রের ব্যবহার এবং জিপিএস, যোগাযোগ ও গোয়েন্দা উপগ্রহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের প্রকল্পে তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। চালু অবস্থায় কোনো চুল্লি পৃথিবীতে ফিরে এলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।

চাঁদের গর্তে জমে থাকা বরফ উত্তোলনে এসব চুল্লির বিদ্যুৎ কাজে লাগবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বরফ থেকে পানীয় জল, বাতাস ও রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব।

আসলে মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা পরাশক্তিগুলোর এই দৌড়কে তীব্র করছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করেছে। কর্মকর্তারা বলেন, এসব অস্ত্র মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহার করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রগুলোর বিস্তারিত জানায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো উপগ্রহ ধ্বংস করার অস্ত্র নয়; বরং যোগাযোগে বাধা সৃষ্টিকারী যন্ত্র হতে পারে।

.

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, নাসার ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ২০ কিলোওয়াট। এটি কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই পাঁচ বছর চলতে পারবে।

চুল্লিটি ছোট আকারের হবে। এর ওজন ৬ হাজার কেজির কম। এটি এমন একটি রকেটের ভেতরে রাখা যাবে, যার দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৭ মিটার ও প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটার।

রাশিয়াও একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করছে। এর নাম ‘সেলেনা’। এটি ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই ১০ বছর চলবে। ২০৩৬ সালের দিকে চীনের নেতৃত্বাধীন চাঁদের ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এটি প্রস্তুত হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।

.

সেলেনার ওজন হবে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজি। ফলে চাঁদের পৃষ্ঠে এটি তুলনামূলক সহজে ও নিরাপদে অবতরণ করানো সম্ভব হবে।

মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষ থেকে আশির দশক পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে ৩০টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি পাঠিয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা উপগ্রহে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এগুলো ব্যবহার করা হতো। প্রায় ১ হাজার কেজি ওজনের এসব চুল্লি ইউরেনিয়াম পরমাণু ভাঙার মাধ্যমে তাপ তৈরি করত। সেই তাপ থেকে ৩ থেকে ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। এসব চুল্লি এখন আর সচল নেই। এর মধ্যে আর অন্য কোনো দেশ মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠায়নি।

.

চাঁদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি যথেষ্ট নয়। ব্যাটারি ও ডিজেলও ব্যয়বহুল। কারণ, সবকিছু পৃথিবী থেকে পাঠাতে হবে। তাই পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান।

সাইমন মিডলবার্গ, যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক

.

গত ৭০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উন্নত কর্মসূচিতে ২ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। তবে ১৯৬৫ সালের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প ছাড়া দেশটি কখনো সফলভাবে মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠাতে পারেনি। ওই পরীক্ষায় উপগ্রহে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। শুরুতে এটি কাজ করলেও উপগ্রহের একটি অ-পারমাণবিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ায় ৪৩ দিন পর চুল্লিটি বন্ধ হয়ে যায়। সেটি এখনো মহাকাশে ভাসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আগের কয়েকটি মহাকাশ পারমাণবিক প্রকল্প বাজেটের অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের কারণে থেমে গেছে।

.

প্রথমে পৃথিবীতে চুল্লি তৈরি করা হবে। এরপর একটি রোবটচালিত মহাকাশযানে করে সেটি চাঁদে পাঠানো হবে। মহাকাশযানটি রকেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে ধীরে ধীরে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জানিয়েছে, চাঁদে পৌঁছানোর আগে চুল্লিগুলো বন্ধ থাকবে। এতে দুর্ঘটনা ঘটলেও তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কম থাকবে।

চাঁদে স্থাপনের পর চুল্লিগুলো বছরের পর বছর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলবে। এগুলো চাঁদের পৃষ্ঠে খনিজ উত্তোলন ও গবেষণায় নিয়োজিত ঘাঁটিগুলোকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।

.

যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে ঘাঁটি নির্মাণ করতে চায়। সেখানে বরফের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই বরফ রয়েছে এমন কিছু গর্তে, যেখানে লাখ লাখ বছর ধরে সূর্যের আলো পৌঁছায়নি।

চাঁদের ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি বরফ উত্তোলনেও চুল্লিগুলো কাজে লাগবে। বরফ থেকে পাওয়া পানি চাঁদে বসবাস ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করা যাবে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক চাঁদ থেকে অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকনের মতো খনিজ উত্তোলনের কথাও বলেছেন। এসব উপাদান দিয়ে উপগ্রহ তৈরি করা সম্ভব।
তবে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চাঁদের ঘাঁটিগুলো চালানো কঠিন। চাঁদের কোনো একটি স্থানে সূর্যের আলো থাকে প্রায় অর্ধেক সময়। ফলে সৌর প্যানেলগুলো মাসে প্রায় দুই সপ্তাহ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না।

.

চাঁদে স্থাপনের পর চুল্লিগুলো বছরের পর বছর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলবে। এগুলো চাঁদের পৃষ্ঠে খনিজ উত্তোলন ও গবেষণায় নিয়োজিত ঘাঁটিগুলোকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।

.

যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গ আল-জাজিরাকে বলেন, চাঁদের ঘাঁটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি যথেষ্ট নয়। ব্যাটারি ও ডিজেলও ব্যয়বহুল। কারণ, সবকিছু পৃথিবী থেকে পাঠাতে হবে। তাঁর মতে, পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান। তবে তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে। মিডলবার্গ বলেন, চাঁদের বরফ উত্তোলন ও ঘাঁটি পরিচালনার জন্য তিন বা চারটি চুল্লি একসঙ্গে চালানোর প্রয়োজন হতে পারে।

.

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের এই প্রতিযোগিতার পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর নির্দেশ দেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

এ বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি বলেন, ‘আমরা চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় আছি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আছি।’

.গাজায় নিজের সেনাসন্তান নিহত হওয়াতেই কি রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন আইজেনকট .

ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গের মতে, ২০৩০ সালের লক্ষ্য সম্ভবত চুল্লি তৈরি শেষ করার সময়সীমা। তবে চাঁদে চুল্লি অবতরণ করানো ও নিরাপদে স্থাপন করাই হবে সবচেয়ে কঠিন কাজ। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পারমাণবিক প্রযুক্তি নয়। বরং উৎক্ষেপণের অনুমোদন, উৎক্ষেপণযানের প্রাপ্যতা এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নিরাপদে অবতরণ ও ব্যবস্থা স্থাপন।’

.

মিডলবার্গের মতে, চুল্লি উৎক্ষেপণের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ, ব্যবহারের আগে ইউরেনিয়াম খুব বেশি তেজস্ক্রিয় নয়। তবে চুল্লি চালু হওয়ার পর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চালু অবস্থায় কোনো চুল্লি পৃথিবীতে ফিরে এলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।

১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কসমস ৯৫৪’ নামের একটি উপগ্রহ পৃথিবীতে ভেঙে পড়ে। এতে থাকা পারমাণবিক চুল্লির তেজস্ক্রিয় পদার্থ কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ ও অতি ক্ষুদ্র কণা পরিষ্কার করতে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাতে হয়।

মিডলবার্গের মতে, চাঁদে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দূষিত এলাকা খুব সীমিত থাকবে।

.

আইন অনুযায়ী, চাঁদের মালিক কোনো দেশ নয়। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদ বা এর কোনো অংশের মালিকানা দাবি করতে পারে না। তবে দেশগুলো চাঁদে পাঠানো নিজেদের যন্ত্রপাতির মালিক হতে পারে। চুক্তিতে মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নেই।

লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের পরিচালক আন্তোনিনো সালমেরি আল-জাজিরাকে বলেন, শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও ক্ষতিকর দূষণ এড়ানোর মতো চুক্তির নীতিগুলো মেনে চললে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানো আইনসম্মত হতে পারে।

.নেতানিয়াহুর জোট ছেড়ে বিরোধী জোটে যেতে আগ্রহী ইউটিজে .

অ্যারিজোনার প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী নরবার্ট শর্গোফার বলেন, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে খনিজ উত্তোলনের অধিকার সব চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশের রয়েছে।

.

তবে যে দেশ আগে ভালো মানের বরফের সন্ধান পাবে, তারা সেখানে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করতে পারে। এটি সরাসরি ভূখণ্ডের মালিকানা দাবি নয়। কিন্তু তেজস্ক্রিয়তার আশঙ্কায় অন্য দেশগুলো ওই এলাকায় প্রবেশ করতে চাইবে না।

আন্তোনিনো সালমেরির মতে, নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করলে কোনো দেশের ভূখণ্ডগত অধিকার তৈরি হয় না। কিন্তু পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করলে কার্যত অন্যদের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের গত মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আরেকটি প্রশ্ন তোলা হয়েছে, চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে দায় কার হবে? প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বর্তমান আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার নিয়মগুলো তৈরি করা হয়নি।

.ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসাতে যুক্তরাষ্ট্রের এত তাড়া কেন, প্রতিযোগিতায় রাশিয়া–চীনও

আপডেট সময় : ০৭:৩৬:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানো হলে সেখানে ঘাঁটি নির্মাণ ও খনিজ উত্তোলনে বিপ্লব ঘটতে পারে। তবে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।

.

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ঘোষণা দেয়, ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করা হবে। অন্যদিকে রাশিয়া চীনের সঙ্গে মিলে ২০৩৬ সালের মধ্যে একই লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য মহাকাশ অনুসন্ধান আরও এগিয়ে নেওয়া।

এ ঘোষণার পর মহাকাশে অস্ত্রের ব্যবহার এবং জিপিএস, যোগাযোগ ও গোয়েন্দা উপগ্রহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের প্রকল্পে তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। চালু অবস্থায় কোনো চুল্লি পৃথিবীতে ফিরে এলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।

চাঁদের গর্তে জমে থাকা বরফ উত্তোলনে এসব চুল্লির বিদ্যুৎ কাজে লাগবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বরফ থেকে পানীয় জল, বাতাস ও রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব।

আসলে মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা পরাশক্তিগুলোর এই দৌড়কে তীব্র করছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করেছে। কর্মকর্তারা বলেন, এসব অস্ত্র মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহার করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রগুলোর বিস্তারিত জানায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো উপগ্রহ ধ্বংস করার অস্ত্র নয়; বরং যোগাযোগে বাধা সৃষ্টিকারী যন্ত্র হতে পারে।

.

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, নাসার ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ২০ কিলোওয়াট। এটি কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই পাঁচ বছর চলতে পারবে।

চুল্লিটি ছোট আকারের হবে। এর ওজন ৬ হাজার কেজির কম। এটি এমন একটি রকেটের ভেতরে রাখা যাবে, যার দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৭ মিটার ও প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটার।

রাশিয়াও একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করছে। এর নাম ‘সেলেনা’। এটি ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই ১০ বছর চলবে। ২০৩৬ সালের দিকে চীনের নেতৃত্বাধীন চাঁদের ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এটি প্রস্তুত হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।

.

সেলেনার ওজন হবে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজি। ফলে চাঁদের পৃষ্ঠে এটি তুলনামূলক সহজে ও নিরাপদে অবতরণ করানো সম্ভব হবে।

মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষ থেকে আশির দশক পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে ৩০টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি পাঠিয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা উপগ্রহে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এগুলো ব্যবহার করা হতো। প্রায় ১ হাজার কেজি ওজনের এসব চুল্লি ইউরেনিয়াম পরমাণু ভাঙার মাধ্যমে তাপ তৈরি করত। সেই তাপ থেকে ৩ থেকে ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। এসব চুল্লি এখন আর সচল নেই। এর মধ্যে আর অন্য কোনো দেশ মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠায়নি।

.

চাঁদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি যথেষ্ট নয়। ব্যাটারি ও ডিজেলও ব্যয়বহুল। কারণ, সবকিছু পৃথিবী থেকে পাঠাতে হবে। তাই পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান।

সাইমন মিডলবার্গ, যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক

.

গত ৭০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উন্নত কর্মসূচিতে ২ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। তবে ১৯৬৫ সালের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প ছাড়া দেশটি কখনো সফলভাবে মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠাতে পারেনি। ওই পরীক্ষায় উপগ্রহে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। শুরুতে এটি কাজ করলেও উপগ্রহের একটি অ-পারমাণবিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ায় ৪৩ দিন পর চুল্লিটি বন্ধ হয়ে যায়। সেটি এখনো মহাকাশে ভাসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আগের কয়েকটি মহাকাশ পারমাণবিক প্রকল্প বাজেটের অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের কারণে থেমে গেছে।

.

প্রথমে পৃথিবীতে চুল্লি তৈরি করা হবে। এরপর একটি রোবটচালিত মহাকাশযানে করে সেটি চাঁদে পাঠানো হবে। মহাকাশযানটি রকেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে ধীরে ধীরে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জানিয়েছে, চাঁদে পৌঁছানোর আগে চুল্লিগুলো বন্ধ থাকবে। এতে দুর্ঘটনা ঘটলেও তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কম থাকবে।

চাঁদে স্থাপনের পর চুল্লিগুলো বছরের পর বছর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলবে। এগুলো চাঁদের পৃষ্ঠে খনিজ উত্তোলন ও গবেষণায় নিয়োজিত ঘাঁটিগুলোকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।

.

যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে ঘাঁটি নির্মাণ করতে চায়। সেখানে বরফের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই বরফ রয়েছে এমন কিছু গর্তে, যেখানে লাখ লাখ বছর ধরে সূর্যের আলো পৌঁছায়নি।

চাঁদের ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি বরফ উত্তোলনেও চুল্লিগুলো কাজে লাগবে। বরফ থেকে পাওয়া পানি চাঁদে বসবাস ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করা যাবে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক চাঁদ থেকে অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকনের মতো খনিজ উত্তোলনের কথাও বলেছেন। এসব উপাদান দিয়ে উপগ্রহ তৈরি করা সম্ভব।
তবে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চাঁদের ঘাঁটিগুলো চালানো কঠিন। চাঁদের কোনো একটি স্থানে সূর্যের আলো থাকে প্রায় অর্ধেক সময়। ফলে সৌর প্যানেলগুলো মাসে প্রায় দুই সপ্তাহ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না।

.

চাঁদে স্থাপনের পর চুল্লিগুলো বছরের পর বছর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলবে। এগুলো চাঁদের পৃষ্ঠে খনিজ উত্তোলন ও গবেষণায় নিয়োজিত ঘাঁটিগুলোকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।

.

যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গ আল-জাজিরাকে বলেন, চাঁদের ঘাঁটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি যথেষ্ট নয়। ব্যাটারি ও ডিজেলও ব্যয়বহুল। কারণ, সবকিছু পৃথিবী থেকে পাঠাতে হবে। তাঁর মতে, পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান। তবে তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে। মিডলবার্গ বলেন, চাঁদের বরফ উত্তোলন ও ঘাঁটি পরিচালনার জন্য তিন বা চারটি চুল্লি একসঙ্গে চালানোর প্রয়োজন হতে পারে।

.

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের এই প্রতিযোগিতার পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর নির্দেশ দেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

এ বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি বলেন, ‘আমরা চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় আছি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আছি।’

.গাজায় নিজের সেনাসন্তান নিহত হওয়াতেই কি রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন আইজেনকট .

ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গের মতে, ২০৩০ সালের লক্ষ্য সম্ভবত চুল্লি তৈরি শেষ করার সময়সীমা। তবে চাঁদে চুল্লি অবতরণ করানো ও নিরাপদে স্থাপন করাই হবে সবচেয়ে কঠিন কাজ। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পারমাণবিক প্রযুক্তি নয়। বরং উৎক্ষেপণের অনুমোদন, উৎক্ষেপণযানের প্রাপ্যতা এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নিরাপদে অবতরণ ও ব্যবস্থা স্থাপন।’

.

মিডলবার্গের মতে, চুল্লি উৎক্ষেপণের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ, ব্যবহারের আগে ইউরেনিয়াম খুব বেশি তেজস্ক্রিয় নয়। তবে চুল্লি চালু হওয়ার পর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চালু অবস্থায় কোনো চুল্লি পৃথিবীতে ফিরে এলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।

১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কসমস ৯৫৪’ নামের একটি উপগ্রহ পৃথিবীতে ভেঙে পড়ে। এতে থাকা পারমাণবিক চুল্লির তেজস্ক্রিয় পদার্থ কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ ও অতি ক্ষুদ্র কণা পরিষ্কার করতে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাতে হয়।

মিডলবার্গের মতে, চাঁদে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দূষিত এলাকা খুব সীমিত থাকবে।

.

আইন অনুযায়ী, চাঁদের মালিক কোনো দেশ নয়। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদ বা এর কোনো অংশের মালিকানা দাবি করতে পারে না। তবে দেশগুলো চাঁদে পাঠানো নিজেদের যন্ত্রপাতির মালিক হতে পারে। চুক্তিতে মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নেই।

লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের পরিচালক আন্তোনিনো সালমেরি আল-জাজিরাকে বলেন, শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও ক্ষতিকর দূষণ এড়ানোর মতো চুক্তির নীতিগুলো মেনে চললে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানো আইনসম্মত হতে পারে।

.নেতানিয়াহুর জোট ছেড়ে বিরোধী জোটে যেতে আগ্রহী ইউটিজে .

অ্যারিজোনার প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী নরবার্ট শর্গোফার বলেন, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে খনিজ উত্তোলনের অধিকার সব চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশের রয়েছে।

.

তবে যে দেশ আগে ভালো মানের বরফের সন্ধান পাবে, তারা সেখানে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করতে পারে। এটি সরাসরি ভূখণ্ডের মালিকানা দাবি নয়। কিন্তু তেজস্ক্রিয়তার আশঙ্কায় অন্য দেশগুলো ওই এলাকায় প্রবেশ করতে চাইবে না।

আন্তোনিনো সালমেরির মতে, নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করলে কোনো দেশের ভূখণ্ডগত অধিকার তৈরি হয় না। কিন্তু পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করলে কার্যত অন্যদের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের গত মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আরেকটি প্রশ্ন তোলা হয়েছে, চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে দায় কার হবে? প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বর্তমান আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার নিয়মগুলো তৈরি করা হয়নি।

.ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি