
একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে এক লাইনের রসিকতা। তার জেরে চীনের তিনটি ব্র্যান্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি স্প্যানিশ লিগের ম্যাচ দেখানো বন্ধ রেখেছে। ক্ষমা চেয়েছেন এমবাপ্পে নিজে, লা লিগা এবং রিয়াল মাদ্রিদও।
এমনকি স্পেনে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথাও বলেছেন লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস। সংকট সামাল দিতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর চীন সফরে যাওয়ারও কথা রয়েছে। এত কিছুর পরও মন গলছে না সিসিটিভির মূল প্রতিষ্ঠান চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি)। তাদের দাবি, রিয়াল মাদ্রিদকে ‘যথাযথভাবে ক্ষমা’ চাইতে হবে।
চীনের এমন কঠোর অবস্থান আর দেশটিকে শান্ত করতে স্প্যানিশ ফুটবলের শীর্ষ লিগের এমন নমনীয়তায় অনেকেরই ভ্রু কুঁচকেছে। চীনের ওপর এমন কী নির্ভরতা লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদের যে এতটা নত হতে হচ্ছে? কেউ কেউ অবশ্য জানেন, কারণটা অর্থনৈতিক। কিন্তু সেটা আসলে কতটা? ফুটবল দুনিয়ায় উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তি না হয়েও কীভাবে ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ক্লাবকে চাপে ফেলে দিয়েছে চীন?
.
বিতর্কের সূত্রপাত ফরাসি অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ দেওয়া এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকার থেকে। সেখানে তিনি বলেন, এমন একটি ভিডিও তাঁর ভালো লেগেছিল, যেখানে তাঁর মুখ বসানো হয়েছিল একজন ‘চীনা স্বৈরশাসকের’ শরীরে। কথাটি বলার সময় পর্দায় দেখা যায় চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের অবয়ব।
মাওকে নিয়ে এমন ঠাট্টা চীনে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমবাপ্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়। ২৭ অক্টোবর চীনের তিনটি প্রতিষ্ঠান ডংপেং, মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করে। এমবাপ্পে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে ক্ষমা চায় লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদও।
২৮ অক্টোবর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা এমবাপ্পের ক্ষমা প্রার্থনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এর মধ্যেই চীনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগু রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের পরবর্তী ম্যাচ সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
.স্যান্ডউইচের গোল রুটি থেকে মাও সে–তুং, এমবাপ্পের ‘ডিক্টেটর’ মিমে চীন–স্পেন সম্পর্কে ঝড়.
চীনের বাজারে লা লিগার গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রথমে দেখতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের অর্থনীতি।
ইউরোপের বড় ফুটবল লিগগুলোর আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ম্যাচ সম্প্রচারের স্বত্ব বিক্রি। নিজ দেশের বাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সম্প্রচারক ও প্ল্যাটফর্মের কাছে এই স্বত্ব বিক্রি করে লিগগুলো। সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য নির্ভর করে দর্শকের আগ্রহ, বাজারের আকার, প্রতিযোগিতামূলক দর এবং চুক্তির শর্তের ওপর।
লা লিগার একটি সূত্রের বরাতে এএফপির ২৮ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪–২৫ মৌসুমে লিগটির আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য ছিল ৭৪৮ মিলিয়ন ইউরো। সূত্রটির দাবি, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে লা লিগার আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্ব থেকে আসা আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জোগায়।
এখানে চীনের একক অবদান কত, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে দুই দেশের সম্মিলিত অবদানই যখন আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তখন চীনের গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির বিশাল দর্শকগোষ্ঠী সম্প্রচারকদের জন্যও বড় আকর্ষণ। দর্শক বেশি হলে বিজ্ঞাপন বিক্রি, গ্রাহক ধরে রাখা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ থাকে। সেই সম্ভাবনার ভিত্তিতেই সম্প্রচারস্বত্বের দর নির্ধারিত হয়।
.
চীনসহ এশিয়ার বাজার ধরার জন্য লা লিগার পরিকল্পনা বেশ আগের। ২০১৬ সাল থেকে লা লিগা তাদের ম্যাচের সূচি এশীয় সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সাজিয়েছে, যাতে এ অঞ্চলের দর্শকেরা সুবিধাজনক সময়ে খেলা দেখতে পারেন। লক্ষ্য ছিল দর্শকসংখ্যা বাড়ানো, সেই সূত্রে বাড়ানো সম্প্রচারস্বত্বের মূল্যও।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম সিটি এএমের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওই সময় থেকে লা লিগা আটটি দেশে নয়টি কার্যালয় খুলেছে। এর মধ্যে দুটি চীনে। ২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তির খবর দিয়েছিল এবিইউ (এশিয়া-প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন)। চুক্তির মোট মূল্য ছিল ৩৭৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশি, অর্থাৎ বছরে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ইউরো।
.
সর্বশেষ বড় পদক্ষেপ এ বছরের আগস্টে মিগুর সঙ্গে চুক্তি। ৩ আগস্ট লা লিগা ঘোষণা করে, চায়না মোবাইলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগু ২০২৬–২৭ থেকে ২০২৯–৩০ মৌসুম পর্যন্ত মূল ভূখণ্ড চীনে লিগটির একচ্ছত্র ডিজিটাল সম্প্রচার সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে লা লিগার ৩৮০টি ম্যাচই মিগুতে দেখার সুযোগ পাবেন চীনের দর্শকেরা।
চুক্তির অর্থমূল্য প্রকাশ করা হয়নি। বেইজিংয়ে গিয়ে তেবাস নিজেই চুক্তি সই করেছেন। মজার বিষয়, এ-সংক্রান্ত লা লিগার বিজ্ঞপ্তিতে চীনা দর্শকদের কাছে লিগটির আকর্ষণ হিসেবে এমবাপ্পের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিএমজির সঙ্গে ফ্রি-টু-এয়ার সম্প্রচারের চুক্তিও করে লা লিগা। ফুটবল এসপানার প্রতিবেদনে তেবাসের বরাতে বলা হয়েছে, চীনে লা লিগার সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য কয়েক বছরে কমে গিয়েছিল। বিনা মূল্যে সম্প্রচারের মাধ্যমে দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়ে সেই মূল্য ফিরিয়ে আনাই ছিল লক্ষ্য।
চুক্তিটি সই হয়েছিল সিএমজির প্রধান শেন হাইশিয়ংয়ের সঙ্গে। তিনি একই সঙ্গে চীনের প্রচারবিষয়ক উপমন্ত্রী। অর্থাৎ স্প্যানিশ ফুটবল লিগটির সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে দরকষাকষির টেবিলের অপর প্রান্তে শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারব্যবস্থাও।
.
লা লিগার স্বার্থ যেখানে মূলত সম্প্রচারস্বত্ব ও লিগের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে, রিয়াল মাদ্রিদের হিসাব সেখানে আরও বিস্তৃত। জার্সি, মার্চেন্ডাইজ, স্পনসরশিপ এবং ক্লাবের ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক মূল্য—সবকিছুর সঙ্গেই চীনের বাজারের সম্পর্ক রয়েছে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার তথ্য অনুসারে, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি ও অন্যান্য মার্চেন্ডাইজ বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে চীন থেকে। টাকার অঙ্কে কত, তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংখ্যাটি যে কম নয়, তা বোঝা যায় ক্লাবটির সামগ্রিক ব্যবসার আকার থেকে।
ডেলয়েটের ফুটবল মানি লিগ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৬১ মিলিয়ন ইউরো, যা ফুটবল ক্লাবগুলোর মধ্যে বিশ্বে সর্বোচ্চ।
.
চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে রিয়ালের বাণিজ্যিক সম্পর্কও গভীর। ক্লাবটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে হাইসেন্স ও লিংলং টায়ারের মতো চীনা প্রতিষ্ঠান। হাইসেন্স ২০২৪ সালে তিন বছরের চুক্তিতে স্পেন, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক অংশীদার হয়েছে। লিংলং টায়ার ক্লাবটির বৈশ্বিক অংশীদার এবং ২০২৫–২৬ মৌসুমের জন্য চুক্তি নবায়ন করেছে। এসব চুক্তির আর্থিক অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি।
এমনকি রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতাও রয়েছে চীনের সঙ্গে। তাঁর নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এসিএসের চীন ও হংকংয়ে একাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
অর্থাৎ চীনের সঙ্গে রিয়ালের সম্পর্ক শুধু ফুটবল বা জার্সি বিক্রিতে সীমাবদ্ধ নয়। ক্লাবটির বাণিজ্যিক অংশীদার, ব্র্যান্ডের বাজার এবং শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়িক যোগাযোগ—সব মিলিয়েই দেশটি গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তাই সহজে নেওয়ার সুযোগ নেই।
.
চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে ক্রীড়াশিল্পের মোট আকার ৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। দেশটির নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ক্রীড়াপণ্য, ক্রীড়া অনুষ্ঠান, অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সেবার বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনের ক্রীড়াশিল্পের মোট উৎপাদনমূল্য ছিল ৩.৮৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান।
এই সংখ্যাগুলো লা লিগা বা রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। তবে বিদেশি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কত বড়, তা বোঝায়।
আর বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা খাওয়ার শঙ্কাতেই রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগা এখন চীনের মন রক্ষায় মরিয়া।
মাঠে রিয়াল মাদ্রিদ ইউরোপের সবচেয়ে সফল ও ধনী ক্লাবগুলোর একটি। লা লিগা শীর্ষ দুই জনপ্রিয় লিগের একটি। কিন্তু বৈশ্বিক ব্যবসার খেলায় তারাও চীনের মতো বড় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। চীনের কাছে আটকে পড়ার জায়গাটা এখানেই।
.এমবাপ্পের ওপর ক্ষোভ কেন, জিজ্ঞেস করেও জানতে পারছেন না চীনারা
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.