
একজন ব্যক্তি জানতেন যে তিনি একটি সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তা সত্ত্বেও তিনি সাধারণ দিনের মতো কর্মস্থলে গেলেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা করলেন। কয়েক দিন পর তাঁর এক সহকর্মী একই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন।
প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুর দায় কি ওই অসচেতন ব্যক্তির ওপর বর্তাবে? ইসলামের দৃষ্টিতে একে কি ‘অপরাধমূলক অবহেলাজনিত মৃত্যু’ বা ‘ভুলবশত হত্যা’ বলা যাবে? নাকি শুধুই একটি দুর্ঘটনামূলক ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব?
সবচেয়ে বড় কথা, সংক্রামিত ব্যক্তি থেকেই যে ভাইরাসের উৎপত্তি এবং তার ফলেই যে মৃত্যু ঘটেছে, তা আদালতে শতভাগ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার উপায় কী?
প্রথম দৃষ্টিতে ঘটনাটিকে একটি সাধারণ অপরাধমূলক কাঠামোর মতো মনে হলেও, স্রেফ সন্দেহ থেকে অপরাধ প্রমাণের আইনি চত্বরে পৌঁছানোর পথটি জটিল।
কারণ সংক্রামক ব্যাধি কোনো উপসর্গহীন ব্যক্তির থেকেও ছড়াতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তির একাধিক উৎস থেকে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে, আবার পুরোপুরি সতর্ক থাকার পরও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তাই সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানোর কারণে আইনি বা ইসলামি দায় নির্ধারণ করতে হলে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ইসলামি ফিকহ এবং বিচার বিভাগীয় প্রমাণাদির সমন্বিত বিশ্লেষণ অপরিহার্য।
.
মহামারি বা ছোঁয়াচে রোগের সংক্রমণকালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না, বরং তা অন্যের অধিকার ও সার্বজনীন সুরক্ষার অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।
.
ইসলামি আইনে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অন্যের ক্ষতি না করার নীতিকে মৌলিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) একটি সার্বজনীন নীতি ঘোষণা করে বলেছেন, “কারো ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পাল্টা ক্ষতিও করা যাবে না।” (সহিহ ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)
সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার রোধে অসুস্থ ও সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার দিকনির্দেশনা দিয়ে মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, “রোগাক্রান্ত পশুকে যেন সুস্থ পশুর কাছে নেওয়া না হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৭১)
মহামারি বা ছোঁয়াচে রোগের সংক্রমণকালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না, বরং তা অন্যের অধিকার ও সার্বজনীন সুরক্ষার অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে রোগটি যদি হাঁচি-কাশি, বাতাস বা দৈহিক সংস্পর্শে দ্রুত ছড়ায়, তবে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন কিংবা মাস্ক ব্যবহারের মতো নির্দেশনাবলি পালন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।
.বিবাহপূর্ব রোগ: কতটা প্রকাশ বাধ্যতামূলক, কতটা ব্যক্তিগত.
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইসলামে জীবন রক্ষার (হিফজুন নাফস) অন্তর্ভুক্ত এবং এটি আল্লাহর ওপর সঠিক তাওয়াক্কুলেরই বাস্তব রূপ। (মুহাম্মদ আলী বালাও, মাউসুআতু নাওয়াজিলিল আমরাদ ওয়াল আওবিআ: জাদু আল-মুফতি ওয়া মারজিউ আল-মুস্তাফতি, ১/৯৯–১০৬, দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যা, বৈরুত, ২০১৪)
.
ইসলামি আইনশাস্ত্রে ক্ষয়ক্ষতি বা অপরাধের দায় নির্ধারণে দুটি ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করা হয়: সরাসরি সম্পাদন ও পরোক্ষ কারণ সৃষ্টি।
সরাসরি সম্পাদন মানে যখন কারো সরাসরি কাজের ফলে তাৎক্ষণিক ক্ষতি ঘটে; যেমন—কারো শরীরে ক্ষতিকর বা সংক্রামিত পদার্থ প্রয়োগ করা কিংবা খাবারে জীবাণু মিশিয়ে দেওয়া। একে বলে ‘মুবাশারা’।
আর পরোক্ষ কারণ মানে যখন কোনো ব্যক্তির আচরণের মধ্য দিয়ে একটি ক্ষতিকর পরিবেশ বা মধ্যবর্তী মাধ্যমের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীকালে ক্ষতির রূপ নেয়। একে বলা হয় ‘তাসাব্বুর’।
.
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাস্ক, দূরত্ব বা অন্যান্য নিয়ম মেনে চলেছেন। এরপরও যদি দুর্ঘটনাবশত কেউ সংক্রামিত হয়, তবে এর জন্য তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।
.
দৈনন্দিন মেলামেশার মাধ্যমে ছড়ানো অধিকাংশ সংক্রামক ব্যাধি তাসাব্বুরের আওতায় পড়ে। কারণ বাতাসের মান, আক্রান্ত ব্যক্তির অনাক্রম্যতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, সান্নিধ্যের সময়সীমা ইত্যাদি অনেকগুলো মধ্যবর্তী উপাদান এখানে কাজ করে।
পরোক্ষ কারণের ওপর ভিত্তি করে আইনি দায় চাপাতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক: স্পষ্ট অবহেলা বা সীমালঙ্ঘন, সুনির্দিষ্ট শারীরিক ক্ষতি এবং ব্যক্তির আচরণের সঙ্গেই ক্ষতির সরাসরি যোগসূত্র।
.
চিকিৎসা আইনশাস্ত্রের আলোকে সংক্রমণ ছড়ানোর ঘটনাকে মূলত ৪ ভাগে ভাগ করা যায়:
১. না জেনে সংক্রমণ ছড়ানো: কোনো ব্যক্তি নিজের রোগের বিষয়ে একদমই অজ্ঞ এবং কোনো উপসর্গও প্রকাশ পায়নি। এই অবস্থায় সাধারণ মেলামেশায় যদি অন্য কেউ সংক্রামিত হয়, তবে ওই ব্যক্তি ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নির্দোষ। কারণ ইসলামের জবাবদিহিতা জ্ঞান ও সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
২. জেনেও প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলা: ব্যক্তি নিজের ব্যাধি সম্পর্কে সচেতন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাস্ক, দূরত্ব বা অন্যান্য নিয়ম মেনে চলেছেন। এরপরও যদি দুর্ঘটনাবশত কেউ সংক্রামিত হয়, তবে এর জন্য তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। কারণ তিনি সাধ্যমতো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন।
.প্রাকৃতিক খাদ্যেই আল্লাহর রোগ নিরাময়ের প্রতিশ্রতি.
৩. জেনে শুনে অবহেলা প্রদর্শন: ব্যক্তি নিজের সংক্রামক রোগের কথা জেনেও লোকালয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, আইসোলেশন মানেননি কিংবা তথ্য গোপন করেছেন। এমন আচরণ ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক পাপ ও অবহেলা হিসেবে গণ্য।
যদি প্রমাণিত হয় যে তাঁর এই অবহেলার কারণে কেউ সংক্রামিত হয়ে মারা গেছেন, তবে তা ‘অপরাধমূলক অবহেলাজনিত মৃত্যু’ বা ভুলবশত হত্যার শামিল হতে পারে এবং তাঁর ওপর আর্থিক ক্ষতিপূরণ (দিয়াত) কিংবা প্রশাসনিক দণ্ড বর্তাতে পারে। (মুহাম্মদ আলী বালাও, মাউসুআতু নাওয়াজিলিল আমরাদ ওয়াল আওবিআ, ২/৩৫২)
৪. ইচ্ছাকৃতভাবে রোগ ছড়ানো: যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে নিজের সংক্রামক রক্ত বা জীবাণু ছড়ায়, তবে তা সবচেয়ে গুরতর অপরাধ। ইচ্ছাকৃতভাবে সংক্রামক ব্যাধি (যেমন এইচআইভি) ছড়ানো সম্পূর্ণ হারাম এবং অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কঠোর দণ্ড প্রদানযোগ্য। (আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি, প্রস্তাবনা নম্বর: ৯০ (৯/৭), বিষয়: এইডস রোগ ও এর ফিকহি বিধান, ১৯৯৫)
.
ফিকহি বিচারে শুধু দুই ঘটনার সময়ক্রম দেখে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। শুধু ‘ক’ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের পরই ‘খ’ ব্যক্তি অসুস্থ হয়েছে—এই ঘটনাটিই অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়।
ভাইরাসের জিনগত মিল থাকলেও স্রেফ ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে ঠিক কোন ব্যক্তি কার শরীরে রোগটি প্রথম সংক্রামিত করেছেন। (ভিলাবোনা-অ্যারেনাস, কশন নিডেড ইন ফাইলোজেনেটিক ইন্টারপ্রিটেশন ডিউরিং আ প্যান্ডেমিক, নেচার মাইক্রোবায়োলজি, ভল. ৫, নং ১২, ২০২০, পৃ. ১৪৩৫–১৪৩৭)
.
এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির সামাজিক মেলামেশাকে অবহেলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে করোনা বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রামক রোগ বায়ুবাহিত হওয়ায় এতে অবহেলার সুযোগ বেশি।
.
তাই বিচারালয়ে জিনগত প্রমাণের পাশাপাশি অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণের (যেমন: সান্নিধ্যের সময়, মেলামেশার প্রকৃতি, অন্যান্য উৎসের অনুপস্থিতি) সমন্বয়েই চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।
আবার এইচআইভি বা এইডস কোলাকুলি, করমর্দন বা সাধারণ সামাজিক মেলামেশায় ছড়ায় না। ফলে এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির সামাজিক মেলামেশাকে অবহেলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে করোনা বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রামক রোগ বায়ুবাহিত হওয়ায় এতে অবহেলার সুযোগ বেশি। (রেসপিরেটরি ভাইরাস গাইডেন্স, সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, ১ মার্চ ২০২৪, ডব্লিউডব্লিউডব্লিউ.সিডিসি.গভ)
সুতরাং শুরুতে উল্লিখিত ঘটনাটিতে, স্রেফ মেলামেশার কারণে ওই অসুস্থ কর্মীকে সরাসরি ‘খুনি’ বলা ইসলামি বিচারব্যবস্থার নীতিবহির্ভূত। বিচার প্রক্রিয়ায় প্রথমে দেখতে হবে উক্ত কর্মী নিজের অসুস্থতার কথা জানতেন কি না, চিকিৎসকের স্পষ্ট আইসোলেশন নির্দেশ ছিল কি না এবং মৃত ব্যক্তি অন্য কোনো উৎস থেকে সংক্রামিত হওয়ার সুযোগ ছিল কি না।
যদি প্রমাণিত হয় যে কর্মী সম্পূর্ণ না জেনে কাজে এসেছিলেন, তবে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আর যদি তিনি জেনেও অবহেলা করে স্বাস্থ্যবিধি ভাঙেন, তবে নৈতিক অপরাধের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত ক্ষতিপূরণ বা দণ্ড নির্ধারণ করতে পারে।
এভাবে ফিকহ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মেলবন্ধনে একদিকে যেমন সংক্রামিত রোগীর স্বাস্থ্যবিধি ভঙ্গের অপরাধের বিচার নিশ্চিত হয়, তেমনি অন্যদিকে নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা অভিযোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
.কোরআন থেকে রোগ নিরাময়ের সূত্র
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.