
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও স্বাধীনতার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ‘মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ শিরোনামে বিশেষ অনুষ্ঠান করেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা। আলোচক ও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহজাহান আহমেদ। ২৬ অক্টোবর মুক্তিযোদ্ধার বাসার উঠানে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফ উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উঠে আসে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহজাহান আহমেদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, সহযোদ্ধাদের স্মৃতি এবং একাত্তরের রণাঙ্গণের নানা অভিজ্ঞতা। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে আয়োজনের সূচনা হয়।
১৯৫১ সালের ১৮ নভেম্বর বরিশাল সদরের কোতোয়ালি থানার রূপাতলী এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ শাহজাহান আহমেদ। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ রাইফেলসে যোগ দেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন। তাঁর স্মৃতিচারণায় উঠে আসে যুদ্ধের অনিশ্চয়তা, সহযোদ্ধাদের সাহস এবং স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখার গল্প।
.
যুদ্ধকালীন একটি স্মরণীয় ঘটনার বর্ণনায় শাহজাহান আহমেদ জানান, চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেডিও সেন্টারের পশ্চিম দিকে তাঁদের অবস্থান ছিল। একদিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে দুপুরের দিকে একটি প্লাটুনকে প্রস্তুত হতে বলা হয়। খবর ছিল, চট্টগ্রামের নতুনপাড়া ক্যান্টনমেন্টের দিক থেকে পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের ক্যাম্পে আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। তাঁরা দ্রুত পজিশনে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এরপর তাঁদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। মেশিনগানের গোলাগুলির মধ্যে তাঁরা পাল্টা অবস্থান নেন। অভিযানের ঝুঁকি ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁদের পিছু হটতে হয়।
যুদ্ধের সেই সব দিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শাহজাহান আহমেদ তুলে ধরেন, কীভাবে প্রতিনিয়ত জীবন বাজি রেখে তাঁদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছিল।
আরেকটি ঘটনায় শাহজাহান আহমেদ জানান, চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেডিও সেন্টারের পশ্চিম দিকে এক অভিযানে অংশ নেওয়ার সময় তাঁরা চারদিক থেকে মেশিনগানের গুলির মুখে পড়েন। তাঁর এক সহকর্মী ও একজন মুক্তিযোদ্ধা পাশাপাশি অবস্থান করছিলেন। গুলি তাঁদের গায়ের পাশ দিয়ে ও মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। আল্লাহর অশেষ রহমত ও মা-বাবার দোয়ায় তাঁরা সেদিন অক্ষত ছিলেন বলে স্মৃতিচারণা করেন তিনি।
.
যুদ্ধের সময় পরিবার থেকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন এই মুক্তিযোদ্ধা। দীর্ঘ সময় স্বজনদের কোনো খবর না পাওয়া এবং পরিবারও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারার বেদনা তাঁর স্মৃতিতে আজও অমলিন। তবু দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন তাঁকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধার জীবন ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা শোনার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর মুখে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা শোনার মাধ্যমে তরুণদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও জীবন্ত করে তোলাই ছিল এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বন্ধুসভার সভাপতি জাহিদ হাসান, সাধারণ সম্পাদক মোহসিনা রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহিন ফয়সাল, আবদুর রহিম ও আবু তালহা, সহসাংগঠনিক সম্পাদক ফারজানা আক্তার, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক হাসান করিম, প্রচার সম্পাদক আল-ইসনাইন, মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষণা সম্পাদক বিবি মরিয়ম, বইমেলা সম্পাদক আদ্রিতা হক, বন্ধু সাদমুন মিশরী, ইমন দাস, ফওজিয়া আলমসহ অন্য বন্ধুরা।
শেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহজাহান আহমেদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন সভাপতি জাহিদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোহসিনা রহমান।
সাংগঠনিক সম্পাদক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.