
আষাঢ়ের শেষে মাঠে পানি উঠলে আমাদের দাদা-দাদিরা আলাদা করে ভাবতেন না। তাঁরা জানতেন, খেতে খলশে আসবে। ধানের চারা একটু বড় হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট মাছ ঘুরত। গামছা দিয়ে ছেঁকে এই মাছ ধরা হতো। দুপুর বা রাতে পাতে পড়ত খলশে।
এখন তুমি গ্রামে গেলে একই মাঠ দেখবে। ধান আছে, পানিও আছে। মাছটা সেভাবে নেই। অনেক কিশোর খলশের নামও শোনেনি। বয়স্কদের কাছে গেলে প্রায়ই শোনা যায়, ‘আমরা তো ঝুড়ি ভরে খলশে আনতাম।’
মাছটা দেখতে সুন্দর। লম্বায় বড়জোর ১০ সেন্টিমিটার। গায়ে নীলচে আর কমলা রঙের আড়াআড়ি ডোরা। পেটের কাছ থেকে দুটি সুতার মতো পাখনা ঝুলে থাকে। এগুলো দিয়ে সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পথ চেনে, তাই ঘোলা পানিতেও তার অসুবিধা হয় না। এলাকাভেদে নাম বদলায়, কোথাও খলশে, কোথাও খইলসা। এটি গুরামি গোত্রের মাছ। অ্যাকুয়ারিয়ামে যে রঙিন গুরামি রাখা হয়, এরা তাদেরই আত্মীয়।
ধানখেত ছিল খলশের আদর্শ ঘর। পানি অল্প, স্রোত নেই, ধানের গোড়ায় ঘাসপাতা জমে থাকে। লুকানোর জায়গা মেলে, খাবারও মেলে। মশার লার্ভা, ছোট পোকা আর পানির খুদে প্রাণী তার খাবার। এই মাছের মাথার কাছে ল্যাবিরিন্থ নামে একটা বাড়তি শ্বাসঅঙ্গ আছে। তাই সে মাঝেমধ্যে পানির ওপরে উঠে সরাসরি বাতাস নেয়। পানিতে অক্সিজেন কম থাকলেও তার দম আটকায় না।
বর্ষায় প্রজননের সময় পুরুষ খলশে বাসা বানায়। মুখে বাতাস নিয়ে সে পানির ওপরে বুদ্বুদ ছাড়ে। বুদ্বুদগুলো জোড়া লেগে ভাসমান একটা চাক হয়ে যায়। ঘাসের আড়ালে সেটা ভেসে থাকে। মা মাছ ডিম পাড়লে বাবা মাছ ডিমগুলো তুলে চাকের ভেতর রাখে। ডিম ফুটতে সাধারণত এক-দুদিন লাগে। এই সময় সে বাসা পাহারা দেয়, কাছে কেউ এলে তেড়ে যায়। বাসার জন্য দরকার শান্ত পানি আর ঘন জলজ উদ্ভিদ। অগভীর ধানখেত ঠিক সেটাই দিত।
.মৃত্যুর আগে যে মাছ সমুদ্রে যাত্রা করে.
এই শান্ত পরিবেশ এখন আর নেই। প্রথম ধাক্কা এসেছে কীটনাশক থেকে। ধানে পোকা ধরলে কৃষক বিষ ছিটান, ফসল বাঁচানোর জন্য এ ছাড়া তাঁর উপায়ও কম। কিন্তু সেই বিষ খেতের পানিতেই মিশে যায়। বড় মাছ কিছুটা সহ্য করে, ডিম আর পোনা সহ্য করতে পারে না। খলশের খাবার যে পোকামাকড়, সেগুলোও মরে যায়। রাসায়নিক সারও বৃষ্টির পানির সঙ্গে খালবিলে নেমে পানির গুণ নষ্ট করে।
দ্বিতীয় ধাক্কা জলাশয় হারানো। আগে মাঠের পাশে ডোবা আর ছোট খাল থাকত। শুকনা মাসে মাছ সেখানে আশ্রয় নিত, বর্ষায় আবার খেতে ছড়িয়ে পড়ত। এখন অনেক ডোবা ভরাট হয়ে বাড়ি বা রাস্তা উঠেছে। খালগুলো সরু হতে হতে মরে গেছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের বাঁধ আর স্লুইসগেটও নদী থেকে মাঠে মাছের যাতায়াত আটকে দিয়েছে। মাছের চলাচলের পথ যেখানে বন্ধ, সেখানে ঝাঁক টেকে না।
তৃতীয় সমস্যা সেচ। বোরো মৌসুমে গভীর নলকূপ আর পাম্প দিয়ে মাটির নিচ থেকে পানি তোলা হয়। আশপাশের জলাশয় আগেভাগেই শুকিয়ে যায়। চাষের সময় আর ধানের জাত বদলেছে, ফলে মাছের জীবনের সঙ্গে মাঠের পুরোনো মিলও ভেঙেছে।
চতুর্থ সমস্যা অতিরিক্ত মাছ ধরা। আগে মানুষ গামছা আর ঝুড়ি দিয়ে ধরত। এখন ঘন সুতার জাল আর কারেন্ট জাল চলে। কারেন্ট জাল বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, তবু অনেক জায়গায় ব্যবহার হয়। প্রজননের সময় ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়লে পরের বছরের ঝাঁক আর হয় না। শখের অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য ধরাও এর একটা কারণ।
.কোন মাছ ডাঙায় বেঁচে থাকে.
এত ছোট একটা মাছ হারালে কী ক্ষতি, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। ক্ষতি আছে। খলশে মশার লার্ভা খায়, আবার বক আর মাছরাঙার মতো পাখির খাবারও হয়। খাদ্যশৃঙ্খলের মাঝখান থেকে একটা কড়ি খসলে দুই দিকেই টান পড়ে। এ ছাড়া ছোট দেশি মাছ পুষ্টির ভালো উৎস। এতে ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম, আয়রন আর জিংক থাকে। বাংলাদেশের মিঠাপানিতে আড়াই শর বেশি প্রজাতির মাছ আছে। তার বড় একটা অংশই খলশের মতো ছোট মাছ আর এদের অনেকগুলোর সংখ্যা কমছে।
মাছ ফেরানোর কিছু উপায় আছে। ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করলে খেতে মাছ পোকা খায়, তাতে কীটনাশক কম লাগে। বাংলাদেশের কিছু এলাকায় কৃষকেরা এ পদ্ধতি চালু করেছেন। সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা নামের একটা পদ্ধতিও আছে। এতে পোকা দমনের জন্য আগে প্রাকৃতিক শত্রু পোকা আর হাতে বাছাই কাজে লাগানো হয়, বিষ লাগে শেষে। ডোবা আর খাল টিকিয়ে রাখাও দরকার। বর্ষায় ডিমওয়ালা মাছ না ধরলে ঝাঁক বাড়ার সুযোগ পায়।
এসবের কিছু কাজ তুমিও করতে পারো। পাড়ার ডোবা ভরাট হতে দেখলে স্থানীয় প্রতিনিধি বা বড়দের জানাতে পারো। স্কুলের বিজ্ঞান ক্লাবে দেশি মাছ নিয়ে আলোচনা তুলতে পারো। গ্রামে গেলে কৃষকদের কাছে জানতে পারো, ধান-মাছ চাষ বা কম বিষে চাষের কোনো উদ্যোগ আছে কি না। পরেরবার গ্রামে গেলে জিজ্ঞাসা করে দেখো, সেখানকার খেতে খলশে এখনো মেলে কি না। উত্তরটা থেকে বুঝবে, ওই এলাকার মাঠ আর জলাশয় কেমন আছে।
.চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া নয় কেন
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.