
খাবারে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ এবং নজরদারির ঘাটতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, গবেষণার ফলাফলের যথাযথ ব্যবহার এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এসব কথা উঠে এসেছে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর সেফ ফুড (বিএসএসএফ) আয়োজিত ষষ্ঠ জাতীয় কারিগরি সেমিনারে। বিশ্ব ডিম দিবস ও বিশ্ব খাদ্য দিবস–২০২৬ উদ্যাপন উপলক্ষে রোববার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে এই সেমিনার আয়োজন করা হয়। সেমিনারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফুড সেফটি সুশাসন: নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য নীতি, বিজ্ঞান ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে নেতৃত্বদান।’
.
অনুষ্ঠানে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, গবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিএসএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
সেমিনারে ‘কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন ভিত্তি’ শিরোনামে কৃষি ও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক মো. ওয়াকিলুর রহমান। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ (প্রতি ৯ জনে ১ জন) অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়। প্রাণ হারায় প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ। বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ, যার প্রধান কারণ খাদ্যে ভেজাল।
.
ওয়াকিলুর রহমান বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এ ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন কৃষকেরা। অত্যধিক ঘাম, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, ত্বকে সমস্যা, বমি বমি ভাব, মাথা ঝিমঝিম করা এবং শ্বাসের সমস্যা কৃষকদের এখন নিত্যদিনের সমস্যা।
ওয়াকিলুর রহমানের প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক মো. আরিফুল ইসলাম। তিনি ঝুঁকিভিত্তিক নিয়মিত নজরদারি এবং পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, ‘ওয়ান হেলথ’ (সামগ্রিক) পদ্ধতি অনুসরণ এবং উৎপাদনস্থল থেকেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন।
এ ছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জসীম উদ্দীন খাদ্য উৎপাদনে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ঝুঁকি তুলে ধরেন। তিনি উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি বা ‘ফার্ম টু ফর্ক’ পদ্ধতি কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি কৃষকদের উত্তম কৃষিচর্চা বা গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (জিএপি) বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
.
সেমিনারে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যবিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক কে এইচ এম নাজমুল হুসাইন নাজির। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফুড সেফটিতে কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী ও ভোক্তাদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত, ঝুঁকিভিত্তিক ও সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এ প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক সঙ্গীতা আহমেদ বলেন, দেশে আইনের অভাব নেই, কিন্তু প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। একাধিক সংস্থা কাজ করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে কার্যকর ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। গবেষণার ফলাফল সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
.
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ জানান, এত দিন কীটনাশক আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও আমদানি পর্যায়ে পরীক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমান সরকার বন্দরে কীটনাশক পরীক্ষা ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষকদের কৃষিবিষয়ক জ্ঞান বাড়ানো, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি এবং উৎপাদন, বিপণন ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গুণগত মান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড অনুযায়ী খাদ্যনিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করতে হবে। আগামী বছর কাঁঠাল ও আনারস রপ্তানির পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণে নিরাপদ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন কৃষিমন্ত্রী।
.
সেমিনারে সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্সেস ইন্টারন্যাশনালের (সিএবিআই) বাংলাদেশ প্রতিনিধি সালেহ আহমেদ কীটনাশকের ব্যবহারবিধি অনুসরণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সিএবিআই বাংলাদেশসহ মোট ২৭টি দেশে কীটনাশক ডিলারদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলেও আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মৎস্য বিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) খালেদ কনক জানান, বাংলাদেশ ৫২টি দেশে মাছ রপ্তানি করে, যার বাজারমূল্য ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তিনি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগারের সক্ষমতা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
.
খালেদ কনক আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছ আমদানি করে। তবে অ্যাকুয়াকালচার পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছ আমদানির বিষয়ে প্রথমে দুই বছর ধরে পরিদর্শন করবে, এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আরও জানান, সৌদি আরবে অ্যাকুয়াকালচারে উৎপাদিত মাছ রপ্তানির বিষয়েও আলোচনা চলছে। তিনি গবেষক, উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। ‘রেডি টু কুক ও রেডি টু ইট’ খাদ্যপণ্যের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান মৎস্য বিভাগের ডিজি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সেমিনার আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব জীবুন্নাহার খন্দকার। পরে বিএসএসএফের বার্ষিক প্রকাশনা ‘সেফ ফুড ডাইজেস্ট’-এর মোড়ক উন্মোচন ও বিতরণ করা হয়। বিশেষ অতিথিদের মধ্যে ছিলেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আমির হোসেন, বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা অথরিটির চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলামসহ অনেকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.