
এখানে একটা ভুল ধারণা দূর করা দরকার। সকালে ওঠা মানেই বেশি মেধাবী, বেশি পরিশ্রমী কিংবা বেশি সফল হওয়া নয়। আবার রাত জাগতে ভালো লাগে বলেই কেউ অলস, এমনও নয়। দুই ধরনের মানুষেরই কিছু সুবিধা ও অসুবিধা আছে।
২০২১ সালে স্লিপ অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সকালে ঘুম থেকে ওঠা মানুষের কার্যকর স্মৃতির কিছু সুবিধার কথা উঠে এসেছে। কার্যকর স্মৃতি হলো এমন এক ধরনের মানসিক ক্ষমতা, যার সাহায্যে আমরা অল্প সময়ের জন্য তথ্য মনে রেখে তা নিয়ে কাজ করতে পারি। যেমন, মাথায় একটি অঙ্কের কয়েকটি ধাপ মনে রেখে সমাধান করা।
অন্যদিকে, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সন্ধ্যা বা রাতের দিকে বেশি সতর্ক থাকা মানুষের কিছু সৃজনশীল কাজে সামান্য সুবিধা থাকতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে রাত জাগলে সব ধরনের কাজে তুমি ভালো করবে। বাস্তব জীবনে সময়সূচি বড় ভূমিকা রাখে। ধরো, তুমি রাত ১০টার পর সবচেয়ে ভালো পড়তে পারো। কিন্তু তোমার পরীক্ষা সকাল ৯টায়। তখন পরীক্ষার সময় তোমার মস্তিষ্ককে যথেষ্ট সতর্ক রাখতে ঘুম ও পড়ার সময়সূচি ঠিক করা জরুরি।
একইভাবে, একজন রাত জাগা কর্মীকে যদি প্রতিদিন সকাল ৯টায় গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন দিতে হয়, তাহলে তিনি দিনের ওই সময়ে কিছুটা অসুবিধায় পড়তে পারেন। কারণ, তখন তাঁর শরীর ও মস্তিষ্ক হয়তো পুরোপুরি সক্রিয় হয়নি। এ কারণে জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রায়ান গানিয়ার মনে করেন, নিজের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে কাজের সময় মিলিয়ে নিতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। তিনি নিজে যেমন সকালে ঘুম থেকে ওঠেন। তাই লেখালেখির মতো কঠিন কাজগুলো দিনের শুরুতেই করার চেষ্টা করেন।
২০২১ সালে নেচার কমিউনিকেশন্স সাময়ীকিতে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, যারা সকালে ঘুম থেকে ওঠে, তারা সকালে ভালো শিখতে পারে। সকালেই তারা কাজের প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে পারে। অন্যদিকে, রাত জাগা মানুষেরা সন্ধ্যার দিকে একই ধরনের কাজে তুলনামূলক ভালো করতে পারেন।
অর্থাৎ, তোমার সবচেয়ে কঠিন পড়া কোন সময়ে ভালো হয়, তা খেয়াল করলে ভালো ফল পাবে। তবে স্কুল, পরীক্ষা কিংবা চাকরির সময়সূচি সব সময় নিজের পছন্দমতো সাজানো সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে নিজের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে বাস্তব দায়িত্বের মধ্যে একটা ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে।
.রংপুরের এক কারখানা এবার বিশ্বের সেরা নতুন ভবন.
শরীরের ছন্দ কি আমাদের নৈতিক আচরণেও প্রভাব ফেলে
বিষয়টা আরও মজার। গবেষণায় এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে যে, দিনের কোন সময়ে আমরা সবচেয়ে সতর্ক থাকি, তার সঙ্গে আমাদের নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। আগের কিছু গবেষণায় বলা হয়েছিল, মানুষ সকালে তুলনামূলক বেশি নৈতিক আচরণ করে। একে বলা হয়েছিল মর্নিং মোরালিটি ইফেক্ট। কিন্তু ব্রায়ান গানিয়া ও তাঁর সহগবেষকদের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বিষয়টি সবার জন্য এক নয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠা মানুষ সকালে তুলনামূলক বেশি নৈতিক আচরণ করতে পারেন। আর রাত জাগা মানুষের সন্ধ্যার দিকে একই প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে রাত জাগা মানুষেরা সকালে খারাপ মানুষ হয়ে যান, কিংবা সকালের ওঠা মানুষেরা রাতে অনৈতিক হয়ে পড়েন। গবেষণাটি বরং ইঙ্গিত দেয়, ক্লান্তি ও সতর্কতার মাত্রা আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তুমি যখন খুব ক্লান্ত, তখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব দিক ভেবে দেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ কিংবা নৈতিকভাবে জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজের মানসিক অবস্থার দিকেও খেয়াল রাখা ভালো।
রাত জাগা মানুষের কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি দেখা যায় কেন
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, রাত জাগা মানুষের মধ্যে টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে রাত জাগলেই যে এসব রোগ হবে, তা কিন্তু নয়। ঝুঁকির পেছনে জীবনযাত্রার নানা বিষয় কাজ করতে পারে। এর একটি বড় কারণ হতে পারে শরীরের স্বাভাবিক ঘড়ির সঙ্গে সমাজের সময়সূচির অমিল। রাত জাগা একজন মানুষ হয়তো রাতে দেরি করে ঘুমাতে চান। কিন্তু তাঁকে সকালে উঠতে হয়। ফলে তাঁর ঘুম কমে যায়।
ঘুম কম হলে পরদিন ক্লান্ত লাগে। কাজের চাপে নিয়মিত ব্যায়াম করা কঠিন হতে পারে। রাত জেগে খাওয়ার অভ্যাসও তৈরি হতে পারে। কেউ কেউ বেশি কফি পান করেন, আবার কারও খাবার ও ঘুমের সময় অনিয়মিত হয়ে যায়। এসব অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ, শুধু রাত জাগাই পুরো সমস্যার কারণ নয়। শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সময়সূচি না মেলা এবং তার ফলে তৈরি হওয়া অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
.এভারেস্টের চেয়ে উঁচু কোনো পর্বত কি কখনো ছিল.
তাহলে আমাদের কী করা উচিত
প্রথমে নিজের ঘুমের স্বাভাবিক ধরন বোঝার চেষ্টা করতে হবে। ছুটির দিনে কোনো অ্যালার্ম না থাকলে তুমি কখন ঘুমাতে যাও, কখন ঘুম থেকে ওঠো, আর দিনের কোন সময়ে সবচেয়ে সতেজ বোধ করো, তা লক্ষ করো। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সময়সূচি ঠিক করো। সকালে উঠতে হলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠো। ঘুম থেকে উঠে আলোতে যাও। রাতে ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করো। নিয়মিত ব্যায়াম করো, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে কঠিন ব্যায়াম এড়িয়ে চলো।
সবচেয়ে জরুরি হলো, পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ রাখা। শুধু সকালে ওঠার জন্য ঘুম কমিয়ে দিলে শরীর ও মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে। মনে রেখো, সকালে ঘুম থেকে ওঠাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। তুমি যদি রাতের দিকে বেশি ভালো কাজ করতে পারো, আর তোমার পড়াশোনা, কাজ ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সেই সময়সূচি মানানসই হয়, তাহলে সেটিও স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তব প্রয়োজনের কারণে যদি সকাল সকাল উঠতেই হয়, তাহলে ধীরে ধীরে শরীরের ঘড়িকে নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারো। রাতের পেঁচা থেকে সকালের পাখি হওয়া সম্ভব হতে পারে, তবে তাতে সময় লাগবে। আর প্রতিদিন কয়েক কাপ কফি খেয়ে নিজেকে জাগিয়ে রাখার চেয়ে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বুঝে চলাই অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
.বনে ফেরার অপেক্ষায় গরিলা বিলি
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.