
শরতের শেষভাগে এক পড়ন্ত বিকেলে তখন শীত আসি আসি ভাব; দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারি অ্যাভিনিউর ট্রাম লাইন ধরে মন্থর গতিতে এগিয়ে আসছে একটি ট্রাম। রাসবিহারি অ্যাভিনিউয়ের ডাব হাতে নিয়ে আনমনে রাস্তা পার হচ্ছিলেন এক ভদ্রলোক। ট্রাম কাছে আসতে আশেপাশের মানুষ চিৎকার করে সতর্ক করতে চাইলেন তাঁকে, অবস্থা বেগতিক দেখে চালক অবিরাম ঘণ্টা বাজালেন; কিন্তু কাজ হলো না। ট্রাম যখন থামল, তখন তাঁর দেহ ট্রামের তলায়। ঘটে গেল ইতিহাসের প্রথম ট্রাম দুর্ঘটনা! এই দুর্ঘটনায় নির্জনতায় চলে যাবেন নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশ।
.
রাস্তার পাশের দোকান থেকে ছুটে এলেন দোকানদার চুনিলাল, তিনি কবির অচেতন দেহ উদ্ধার করলেন ট্রামের নিচ থেকে। ততক্ষণে ট্রামের ক্যাচারে আটকে ছিন্নভিন্ন হয়েছে তাঁর শরীর। ট্যাক্সিতে করে কবিকে নিয়ে যাওয়া হলো কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। দুর্ঘটনায় কবির কণ্ঠাস্থি, পাঁজরের হাড়, ঊরুর হাড় ভেঙে ভয়াবহ অবস্থা এবং এক্স–রে পরীক্ষায় দেখা যায় ফুসফুসে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে, সব মিলিয়ে অবস্থা খুবই শোচনীয়। অসুস্থ অবস্থায় কবির হাসপাতালের দিনগুলো ছিল দুর্বিষহ, শরীরে ছিল অসহ্য যন্ত্রণা। মুখে আঘাত ও চোটের ছাপ, শরীরে ব্যান্ডেজ বাঁধা। মৃত্যুর প্রহর ঘনিয়ে আসতেই একদিন রাতে হঠাৎ কবি বললেন, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশজুড়ে।’ হাসপাতালে কবিকে দেখতে একে একে ভিড় জমাতে থাকলেন তাঁর আপনজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা, কিন্তু স্ত্রী লাবণ্য দাশ ছিলেন পুরোপুরি ভিন্ন। সবাই হাসপাতালে সাধ্যমতো সময় দিতেন, অন্যদিকে স্ত্রী লাবণ্য দাশ শুধু দায়টুকু পালন করেছেন। উপরন্তু শেষের দিকে তিনি হাসপাতালে আসা–যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেন, এমনকি কবির মৃত্যুর সময় তিনি পাশে ছিলেন না। এ বিষয়ে কবি ভূমেন্দ্র গুহ তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘জীবনানন্দের মৃত্যুর পর লাবণ্য দাশকে হাসপাতালে আনার জন্য দুবার গাড়ি পাঠানো হলেও তিনি আসেননি।’
.
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com
.
কবি দুর্ঘটনায় পতিত হন ১৪ অক্টোবর, ৮ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৪ মিনিটে হেমন্ত ঋতুর শুরুতে রবীন্দ্রনাথ উত্তর যুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনাবসান ঘটে। হেমন্ত ঋতু নিয়ে ছিল কবির উচ্ছ্বাস, তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘জীবন’ কবিতায় উল্লেখ করেছেন, ‘হেমন্ত আসেনি মাঠে, হলুদ পাতায় ভরে হৃদয়ের বন’। ‘নির্জন স্বাক্ষর’ কবিতায় কবি হেমন্তের পাতার মতো ঝরে যেতে চেয়েছেন; সেই হেমন্তের এক মাঝরাতে ট্রাম দুর্ঘটনায় চিরদিনের জন্য হেমন্তের পাতার মতো ঝরে গেলেন। কবি লিখছেন ‘সব পাখি ঘরে আসে’; তারপর প্রকৃতিতে অনেক হেমন্ত এসেছে কিন্তু নির্জনতার কবি আর কখনো ঘরে ফেরেননি। রক্ত–মাংসের শরীরের জীবনানন্দ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু রয়ে গেছে জীবনানন্দ সৃষ্টিকর্ম! যে কবি লিখেছেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়’; তিনি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়েই বারবার ফিরে এসেছেন বাংলার প্রকৃতিতে হয়তো মানুষ নয়, হয়তো–বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে, হয়তো ভোরের কাক বা হাঁস হয়ে বরিশালের ধানসিঁড়ি নদীর পাড়ে।
.
জীবনানন্দের কবিতায় নির্জনতা নিছক একাকিত্ব নয়, রয়েছে আত্মানুসন্ধান, সময়ের কাছে মানুষের অসহায়তা এবং পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রতি এক গভীর মমতা। কবি তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’–এ প্রথম লাইনে উল্লেখ করেছেন ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’। কবি তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিজীবনের এক দীর্ঘ যাত্রা ও আত্মানুসন্ধান ব্যক্ত করেছেন। জীবনের প্রারম্ভ থেকে মানুষ ছুটে চলেছেন অজানার দিকে, জীবনের কর্ম ও গ্লানি শেষে মানুষ ক্লান্ত হয়ে ফিরেছেন। কিন্তু কবি থাকতে চেয়েছিলেন অন্তহীন এই ছুটে চলা জগৎ সংসারের বাইরে, তাই তো কবির ভ্রাতুষ্পুত্র অমিতানন্দ বলেছিল, ‘জ্যাঠামশাইয়ের আলাদা জগৎ’।
জীবনানন্দ দাশের কবিতা শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যের সমাহার নয়, বরং তাঁর নির্জনতার আশ্রয়, স্মৃতির আঁধার ও উপলব্ধির এক স্বতন্ত্র জগৎ। তিনি ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতায় বাংলার নদী ও প্রকৃতির কাছে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, তেমনি ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ কবিতায় নিজ দেশের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে পৃথিবীকে অনুভব করার এক অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনানন্দের কবিতা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের এক অনন্য সৃষ্টিকর্ম। এ জন্য মৃত্যুর ৭২ বছর পরেও তাঁর কবিতা ফিরে আসে নতুন প্রজন্মের কাছে। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনের ধরনও, তবু জীবনানন্দের কবিতায় যে প্রকৃতির এক স্বতন্ত্র জগৎ ও নির্জনতার আকুলতা, তা আজও বিদ্যমান।
.
কবি জীবনানন্দের জীবনে আরেকটি পালক হলো, বাংলা সাহিত্যের কথিত পঞ্চপাণ্ডবের একজন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের যে কজন কবি রবীন্দ্র ঘরানার বাইরে কবিতা রচনা বা লিখতে পেরেছিলেন, তন্মধ্যে তিনি অন্যতম। এ জন্য তাঁকে ত্রিশ দশকের পঞ্চপাণ্ডবের এক পাণ্ডব বলা হয়। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মৃত্যুর পরে তিনি তাঁর স্মরণে ‘দেশবন্ধুর প্রয়াণে’ নামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হলে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন, ‘এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোন প্রতিষ্ঠিতি কবির ছদ্মনামে রচনা।’ এমনকি ক্ষুরধার কবিতা কবি রচনা করতেন।
জীবনানন্দ দাশের লেখা তাঁর মৃত্যুর পরে ব্যক্তিগত জীবনের এক স্মৃতি পেরিয়ে আজ বাংলা ভাষার এক চিরস্থায়ী আশ্রয়। কবির মৃত্যুর দুবছর পরে যাদব বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির লেখা পাঠ্যসূচিতে যুক্ত করা হয়। ১৯৬০–এর দশকের শুরু থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর এবং পরবর্তী সময়ে স্নাতক সিলেবাসে স্থান দেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির রচনা সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়। তাই জীবনানন্দের মৃত্যু একটি জীবনের সমাপ্তি হলেও তাঁর কবিতা ও রচনার মৃত্যু ঘটেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবির সৃষ্টিকর্ম নতুন পাঠকের মনে নতুন অর্থে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
.
কবির মৃত্যুর পর কলকাতা পুলিশ তাঁর মৃতদেহ ময়নাতদন্ত করার জন্য নাছোড়বান্দা, তখন মুখ্য ভূমিকা পালন করেন কবির অন্যতম সমালোচক সজনীকান্ত দাস। কবির অসুস্থ অবস্থায়ই সজনীকান্তের দৌড়ঝাঁপের ফলেই মূলত কবির সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত হয়। কলকাতার পুলিশ যখন ময়নাতদন্ত করবেন বলে আইনের দোহাই দিল, তিনি শরণাপন্ন হন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের। মুখ্যমন্ত্রী হস্তক্ষেপে মৃত্যুর পর কাটাছেঁড়া থেকে রেহাই পায় কবির দেহ। এরপর কবির মৃতদেহ কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে দাহ করা হয়। চিরকালের জন্য রক্ত–মাংসের শরীরের অবসান হলো।
জানা যায় সেই ট্রামটি এখন আর নেই; কবির ওপর চেপে বসা সেই ঘাতক ট্রাম পরবর্তী সময়ে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সম্ভবত এটাকেই নেমেসিস বলে, নয়তো কবির ঘাতক ট্রাম নিজেই আগুনে কেন পুড়ে শেষ হবে। বাংলা কবিতার নির্জন পথ ধরে কবি জীবনানন্দ দাশ হেঁটে গিয়েছেন বহু দূরে, আরও দূরে, একাকী, নিঃসঙ্গ অবস্থায়। তাঁর কবিতার ঝুলি থেকে খসে পড়েছে বাংলা কবিতার অবিশ্বাস্য সব মায়া-মমতা, প্রকৃতির প্রতি প্রেম এবং অসম্ভব সব শব্দ। সেইসব শব্দ মিশেছে বাংলার আলপথে, মাঠের ধারে, ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে, বাংলার বিস্তীর্ণ চরাচরে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.