
টেক জায়ান্ট মেটার ‘ভায়োলেন্স অ্যান্ড ইনসাইটমেন্ট (সহিংসতা ও সহিংসতায় উসকানি)’ অংশে প্রথম বাক্যের বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘আমাদের প্ল্যাটফর্মের কোনো কনটেন্টের কারণে যাতে বাস্তব জীবনে কোনো সম্ভাব্য সহিংসতা না ঘটে, তা প্রতিরোধ করাই আমাদের লক্ষ্য।’
একই অংশের আরেকটি লাইন হচ্ছে, ‘আমরা এমন বক্তব্য সরিয়ে দিই, যা সহিংসতায় উসকানি দেয় বা সহিংসতা ঘটতে সহায়তা করে এবং জননিরাপত্তা বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বিশ্বাসযোগ্য হুমকি তৈরি করে।’
সাতক্ষীরার দেবহাটার ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের ক্ষেত্রে সব কটিই প্রযোজ্য ছিল। তবু শামীম রক্ষা পেল না। একবার নয়, দুবার ফেসবুক লাইভ, বেশ কিছু পোস্ট দিয়েই শামীমকে হত্যার আয়োজন হয়, যে লাইভগুলো ঘটনার দুই দিন পরও রয়ে গেছে। কিন্তু মেটার কাছে এখনো হয়তো মনে হয়নি, তার প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকে এসব উসকানি কারও ক্ষতি করতে পারে। অথচ শামীম মারা গেছে।
শামীমের ঘটনায় সেই ফেসবুকেই মানুষ হট্টগোল করেছে, বিচার দাবি করেছে। উসকানিদাতাও গ্রেপ্তার হয়েছে। কিছুদিন না যেতে আবারও কোনো এক শামীমের লাশের ছবি ফেসবুকপাড়ায় ঘুরে বেড়াবে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কথা নতুন করে আর নাই–বা টানলাম। কিন্তু ফেসবুকে সহিংসতার আহ্বান ছড়িয়ে এ দেশে বারবার এমন ঘটনায় এই প্ল্যাটফর্মের কি দায় নেই? জবাবদিহি থাকা উচিত নয়?
ফেসবুকে উসকানি ছড়িয়ে হামলার আলোচিত ঘটনার শুরু ১৫ বছর আগে ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামু উপজেলায়। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ হামলা হয়। সেই উসকানি থেমে নেই; বরং বেড়েছে। সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ২০২১ সালে অক্টোবরে কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে ছড়ানো পোস্ট ও ভিডিও বাংলাদেশের অন্তত ১৮টি জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেয়। ফ্রিডম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ওই সহিংসতায় অন্তত ১১ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়। সে সময় সরকার মুঠোফোনে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রেখেছিল।
গত দুই বছরে ফেসবুকে উসকানি ছড়িয়ে হামলা ও হত্যার ঘটনা বেড়ে চলেছে। গত ডিসেম্বরে ৯৫৮টি পোস্টে (দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাবের যৌথ প্রতিবেদন) প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার সরাসরি আহ্বান জানানো বা হামলাকে উদ্যাপন করার প্রমাণ পাওয়া যায়। গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। আক্রান্ত হয় উদীচী ও ছায়ানট। চলতি বছরের এপ্রিলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একজন পীরকে ফেসবুকে উসকানি ছড়িয়ে হত্যা করা হয়।
মেটার নিজস্ব নীতিমালায় সহিংসতার উসকানি, হুমকি, হয়রানি ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরির বিরুদ্ধে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তানীতিতে বলেছে, তারা এমন কনটেন্ট সরিয়ে দেয়, যা মানুষের শারীরিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া মানুষকে হুমকি দেয়—এমন পোস্ট, যা অন্যকে ভয় দেখানো বা কথা বলতে বাধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। সেসব কনটেন্ট তাদের প্ল্যাটফর্মে অনুমোদিত নয়। কিন্তু বাংলাদেশে দিনের পর দিন অনুমোদিত হয়ে আসছে!
গত ডিসেম্বরে গণমাধ্যমে হামলার ঘটনায় মেটার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিছু ইনফ্লুয়েন্সারের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়, যদিও তারা আবারও একই প্ল্যাটফর্মে নতুন অ্যাকাউন্ট চালু করেছে। চলতি বছরের মার্চে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে মেটার ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানায়। তারা সতর্ক করে যে ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্টের বিরুদ্ধে সময়মতো ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বাস্তব জীবনে সহিংসতা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ডিসেম্বরের হামলার আগে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া হুমকি ও উসকানির মাধ্যমে হামলার কথাও তারা উল্লেখ করে।
প্রশ্ন আসে, মেটার এই নিজস্ব নীতি ভাঙতে উন্নত বিশ্বে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়? ২০২১ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাপিটল হিলে সহিংসতার ঘটনায় ফেসবুক তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের সামনে হাজির হতে হয়েছিল মেটার প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গকে।
২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে দাঙ্গায় দেরিতে পদক্ষেপ নেওয়া, উসকানি ছড়ানোয় মেটার বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছিল। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সার্ভিসেস আইনের অধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো সহিংসতা বা ভুয়া খবর ছড়ানো রোধে ব্যর্থ হলে তাদের বিশ্বব্যাপী বার্ষিক টার্নওভার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান করেছে।
এখন স্বভাবতই প্রশ্ন দাঁড়ায়, বাংলাদেশ সরকার কি প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করেনি? কিছুটা করেছে এবং এখনো করছে। তবে অন্য দেশে আইন করার উদ্দেশ্য থাকে নাগরিকের সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে, আর এ দেশে হয় সরকারদলীয় ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিতে। যে কারণে মেটার মতো জায়ান্টদের জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এলে বড় করে ‘মতপ্রকাশের বাধার’ বিষয় সামনে এসে দাঁড়ায়। বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে এ ধরনের আইনের চরম অপপ্রয়োগ হয়।
সম্প্রতি সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে সহিংসতা উসকে দেওয়া, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, সাইবার বুলিং, ভুয়া তথ্য ছড়ানো বা হুমকি দেওয়ার মতো বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু তা মূলত সরকারের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়, সরাসরি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য নয়।
তবে প্রায় চার বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নীতিমালা করার উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের সময়ে এ নীতি প্রয়োগের কে হর্তাকর্তা হবে, তা নিয়ে টেলিযোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে রেষারেষি ছিল, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সমাধান হয়নি। বিএনপি সরকার আসার পর ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়ারি আইন ২০২৬’ নামে একটি আইন তথ্য মন্ত্রণালয় করতে যাচ্ছে বলে আলোচনা আছে।
মেটা একের পর এক তার নিজস্ব নীতিও ভঙ্গ করছে এবং মানুষ মারা যাচ্ছে, তবু তার জবাবদিহি নেই। অবশ্য বাংলাদেশে সরকারগুলোর যে আচরণ, তাতে ডিজিটাল-সংক্রান্ত কোনো নীতি করলে দেশের নাগরিকের পাশাপাশি এই প্ল্যাটফর্মগুলো চিন্তায় থাকে। সর্বশেষ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের এক নীতির কারণে তো মেটা প্রকারান্তরে সেবা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিই দেয়!
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশে বাংলাদেশে উপাত্ত স্থানীয়করণের বাধ্যবাধকতার ও আইন লঙ্ঘনে কারাদণ্ডের বিধান রেখেছিল, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয় মেটা। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে মেটার পাবলিক পলিসি ম্যানেজার রুজান সারওয়ার গত এপ্রিলে ডিজিটালি রাইট ও এনগেজমিডিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত এক সম্মেলনে ক্ষোভের কথা জানান।
সেদিন তিনি বলেন, উপাত্ত স্থানীয়করণের বিধানের জন্য মেটা বাংলাদেশে সেবা বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করেছিল। অবশ্য মেয়াদ শেষের কিছুদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয়করণের বিধান বাদ দেয়। এপ্রিলের সেই কনফারেন্সে মেটার মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ঘটনায় রুজান সারওয়ার প্রশ্নের মুখে পড়েন। তবে ‘অফলাইনে ঘটা সহিংসতা ঠেকানোর দায় সরকারেরই’ বলে তিনি সেদিন মন্তব্য করেন।
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর প্রতি মেটার বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে সমালোচনা আছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২২ সালে মেটার বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে উদ্বেগ জানায়। সে সময় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তারা বলেছিল, মেটার লাভজনক অ্যালগরিদম ও নজরদারিভিত্তিক ব্যবসা মডেল গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোয় জাতিগত বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং সহিংসতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত ‘কেমব্রিজ ফোরাম অন এআই: ল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স’ জার্নালে বলা হয়েছে, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নীতিনির্ধারণে খুব বেশি প্রভাব রাখতে পারে না। এতে বাংলাদেশের ধর্মীয় উত্তেজনা ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বাংলা ভাষার কনটেন্ট শনাক্তে মেটার সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে।
তবু কি এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে না? শুধু ‘এ দেশে অফিস খুলুন’-এর বুলি না আওড়িয়ে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বসা যায় না? প্রতিকারের পথ খোঁজা যায় না?
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.