
ধরুন, শীতের রাতে একটি পানির বোতল ফ্রিজে রেখে দিলেন। পরদিন সকালে বোতলটি বের করে দেখলেন, পানি এখনো স্বচ্ছ ও তরল (অবাক হবেন না, বিশেষ পরিস্থিতে এমনটা সম্ভব)। অথচ থার্মোমিটার বলছে, পানির তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস! অবাক হওয়ার মতোই ঘটনা। কারণ, আমরা জানি, ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি বরফ হয়ে যায়। তাহলে মাইনাস ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পানি তরল থাকল কীভাবে?
এবার বোতলটিতে আলতো করে একটা টোকা দিন, বা একটু ঝাঁকিয়ে নিন। আশ্চর্যজনকভাবে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোতলের ভেতরের পানি বরফে পরিণত হতে শুরু করবে। স্বচ্ছ পানির ভেতর দিয়ে সাদা বরফের স্তর ছড়িয়ে পড়বে। দেখতে মনে হবে, চোখের সামনেই পানি জমে যাচ্ছে! এ ঘটনাকে বলে অতিশীতলীকরণ। বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো তরল তার স্বাভাবিক হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রাতেও তরল অবস্থায় থাকলে তাকে অতিশীতল অবস্থা বলে। পানি সাধারণত ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে জমে যায়। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে সেই তাপমাত্রার অনেক নিচেও তরল থাকতে পারে।
এখানে মজার ব্যাপার হলো, পানি জমার জন্য শুধু ঠান্ডা হওয়াই যথেষ্ট নয়; অনেক সময় বরফের স্ফটিক তৈরির জন্য উপযুক্ত পরিবেশও দরকার হয়। সেই পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারলে অতিশীতল পানি মুহূর্তের মধ্যেই বরফ হয়ে যেতে পারে।
কয়েক বছর আগে এক প্রকৌশলী অন্য প্রকৌশলীদের একটি অনলাইন ফোরামে মজার প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে দ্রুত ঘুরতে থাকা সিমেন্ট মেশানোর ড্রাম কি পানিকে তরল রাখতে পারবে? ধরুন, বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ড্রামটি অবিরাম ঘুরছে। ঘর্ষণ ও আলোড়নের ফলে কিছু তাপও তৈরি হচ্ছে। তাহলে কি সেই তাপ পানিকে জমতে দেবে না?
প্রশ্নটির উত্তরে প্রকৌশলীরা দুই দলে ভাগ হয়ে গেলেন। একদল মনে করলেন, ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে পানি তরল থাকতেই পারে না। অন্য দলের যুক্তি ছিল, তাঁরা এমন ভিডিও দেখেছেন, যেখানে ফ্রিজার থেকে বের করা স্বচ্ছ পানির বোতলে টোকা দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বরফ জমে যায়। তাহলে কোন দলের উত্তর সঠিক ছিল?
আসলে দুই দলেরই কিছুটা ভুল ছিল। কারণ, ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে পানি তরল থাকতে পারে। কিন্তু সেই অবস্থায় পানি জমে যেতে পারে খুব অল্পতেই। বিশেষ করে পানি যদি আলোড়িত হয় বা কোনো উপযুক্ত পৃষ্ঠের সংস্পর্শে আসে, তাহলে বরফ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়। কিন্তু কেন এমন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আগে জানতে হবে, পানি জমে যাওয়ার জন্য আসলে কী প্রয়োজন?
ফ্রিজ থেকে একটি বরফের টুকরো বের করে দেখুন। বরফের ভেতরে পানির অণুগুলো একটি নির্দিষ্ট সুশৃঙ্খল বিন্যাসে সাজানো থাকে। এই বিন্যাসে অণুগুলোর মধ্যে হাইড্রোজেন বন্ধন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বরফের সাধারণ গঠনে অণুগুলো অনেকটা ষড়ভুজাকৃতির কাঠামো তৈরি করে। এই কাঠামোর ভেতরে ফাঁকা জায়গা থাকে। ফলে একই ভরের তরল পানির তুলনায় বরফ বেশি জায়গা দখল করে। এ কারণেই বরফ পানির ওপর ভেসে থাকে। অন্যদিকে তরল পানিতে অণুগুলো ক্রমাগত নড়াচড়া করে। তাদের মধ্যে বন্ধন তৈরি হয়, আবার ভেঙেও যায়। তাপমাত্রা কমলে অণুগুলোর গড় গতিশক্তি কমে আসে। তখন উপযুক্ত পরিস্থিতিতে তারা বরফের সুশৃঙ্খল কাঠামো তৈরি করতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি সমস্যা আছে। বরফ তৈরি হতে হলে প্রথমে কয়েকটি পানির অণুকে একসঙ্গে এমনভাবে সাজতে হবে, যাতে একটি ক্ষুদ্র বরফের স্ফটিক তৈরি হয়। এরপর সেই স্ফটিকটিকে যথেষ্ট বড় ও স্থিতিশীল হতে হবে। নইলে আশপাশের অণুর নড়াচড়ায় সেটি আবার ভেঙে যাবে। তরল পানিতে এমন ক্ষুদ্র গুচ্ছ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বেশির ভাগ গুচ্ছই স্থায়ী হতে পারে না। বরফের একটি স্থিতিশীল সূচনাকারী কণা তৈরি হলে তবেই তার চারপাশে আরও অণু যুক্ত হয়ে বরফ বড় হতে পারে। বরফ তৈরির এই প্রাথমিক প্রক্রিয়াকে বলে নিউক্লিয়েশন। আর যে ক্ষুদ্র কণাটি বরফ তৈরির সূচনা করে, তাকে বলা যায় বরফের বীজ।
সহজভাবে বললে, পানি জমতে শুরু করার জন্য অনেক সময় একটি ছোট্ট সূচনাবিন্দু প্রয়োজন হয়। তাপমাত্রা ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানো মানেই সেই সূচনাবিন্দু তৈরি হয়ে গেছে, এমন নয়। এই কারণেই পরিষ্কার ও স্থির পানি কখনো কখনো ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচেও তরল থাকতে পারে। পানি তখন জমে যাওয়ার উপযুক্ত অবস্থায় থাকলেও বরফ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.