
হাসান হাফিজ সত্তর দশকের কবি। বহুপ্রজ কোবিদ। কবিতা লেখেন, গদ্য লেখেন, শিশুসাহিত্য করেন, সাংবাদিকতা করেন—দুই হাতে। প্রকাশিত গ্রন্থ দুই শতাধিক। গবেষণা গ্রন্থ, সাক্ষাৎকার গ্রন্থ, রঙ্গব্যঙ্গ, ফিচার গ্রন্থ, বিজ্ঞানবিষয়ক, শিশুতোষ রচনাসহ ইত্যাদির সম্ভার। কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ষাটের অধিক। এর মধ্যে দ্বিভাষিক দুটি—একসঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি। বিভিন্ন সময়ে তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, স্প্যানিশ, জার্মান, জাপানি, হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি ও চাকমা ভাষায়। বহু দেশ ঘুরেছেন। বহু পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ পেয়েছেন। স্বভাবগতভাবে উচ্চকিত নন, পরিশ্রমী সাহিত্যিক। জন্ম ১৫ অক্টোবর, ১৯৫৫। সোনারগাঁওয়ের এলাহিনগরে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার আগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স–মাস্টার্স করেছেন। মানে হলো তিনি ডাবল এমএ। যথোপযুক্ত সাফল্যমণ্ডিত জীবন। আজ আরেক ১৫ অক্টোবর। একজন কবি হাসান হাফিজের বয়স আজ ৭১ হলো। মানুষটা কেমন? কবি হাসান হাফিজ যে মানুষটা?—অসামান্য সরল। অজটিল। এই মানুষটার সঙ্গে আমার সখ্য ছাত্রজীবন থেকে। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমাদের নৈকট্য সেই সখ্যকে আরও গাঢ় করেছে। হুমায়ূন আহমেদের অতি পছন্দের মানুষদের একজন ছিলেন হাসান ভাই। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর প্রেমের উপন্যাস (প্রচ্ছদে লেখা ছিল) ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’ উৎসর্গ করেছিলেন হাসান ভাই এবং তাঁর সহধর্মিণীকে:
হুমায়ূন আহমেদের আরেকটা বইয়ের ভূমিকায় হাসান ভাইয়ের কথা দারুণভাবে আছে। সেই ভূমিকা হুবহু তুলে দিচ্ছি:
‘লেখকের কাছ থেকে লেখা আদায়ের অনেক রকম পদ্ধতি আছে। সবচে নিম্ন শ্রেণীর পদ্ধতিটি হল—গলায় গামছা বেঁধে লেখা আদায় করা। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আমার কবি-বন্ধু হাসান হাফিজ ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’র লেখাগুলি আমাকে দিয়ে লিখিয়েছেন। মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে আমি ক্ষিপ্ত হয়ে ভেবেছি, বড় একটা ডান্ডা দিয়ে হাসান হাফিজের মাথায় শক্ত বাড়ি দিই। তারপর থানা–পুলিশ যা হবার হবে।
‘বই আকারে বের করার আগে লেখাগুলি পড়তে গিয়ে ভাল লাগল। মনে হল হাসান হাফিজকে সাময়িকভাবে ক্ষমা করা যায়। আমি এর আগে কোন একটি বই-এ লিখেছিলাম—আত্মকথা–জাতীয় লেখা আর লিখব না। এই বইটিতে কিছু সেরকম রচনা ঢুকে গেছে। পাঠক-পাঠিকারা আমার সে কথা না রাখার অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন—এই প্রার্থনা। বলতে ভুলে গেছি এই গ্রন্থের বেশির ভাগ লেখাই আমার প্রিয় পত্রিকা দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে।’
সেই ১৯৯৪। হুমায়ূন আহমেদ তখনই তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয় লেখক। কোনো পত্রিকায় ধারাবাহিক রচনা লিখবেন—তাঁর জন্য এবং পত্রিকার জন্য বেশ ঝামেলাপূর্ণই ছিল ব্যাপারটা। ‘দৈনিক বাংলায়’ লিখেছিলেন তবু। প্রায় নিয়মিত লিখেছিলেন ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’। সেটা সম্ভব হয়েছিল কীভাবে, বইয়ের ভূমিকা দ্রষ্টব্য। বড় লেখক, বড় আর্টিস্ট। বড় আর্টিস্ট যেমন দুই–তিন টানে একটা পোর্ট্রেট ড্রয়িং করতে পারেন, বড় লেখক তেমন দুই–তিন লাইনে একটা মানুষ লিখে দিতে পারেন। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর কবি-বন্ধু হাসান হাফিজকে নিয়ে লিখেছেন—তাঁদের অন্তরঙ্গতা সেই পর্যায়ের ছিল। গলায় গামছা বেঁধে কথার কথা, হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে লেখা আদায় করার কলাকৌশল হাসান ভাই ভালো জানতেন। সহজ কৌশল-সরল অন্তরঙ্গতা। হাসান ভাই সহজে মানুষের অন্তরঙ্গ হতে পারেন। ঘোরপ্যাঁচ নাই।
হাসান ভাইয়ের ষাটের অধিক কবিতার বইয়ের অধিকাংশের প্রচ্ছদই আমি করেছি। অধিকাংশ বইয়ের নামকরণের পেছনে আমার প্রচ্ছন্ন ভূমিকা আছে। হাসান ভাই দুই–তিনটা নাম ঠিক করে দেন, আমি ভোট দিয়ে একটা ফাইনাল করি। চলছে এভাবে। এত বছর ধরে আমাদের সম্পর্ক। হাসান ভাই আমাকে একটা বিশেষ নামে ডাকেন। সেটা এখানে প্রকাশ করছি না। ভালোবাসা, মায়া–মমতার সব গুমর সবখানে ফাঁস না করা ভালো।
হাসান ভাই সেই ভালো লোকটা। ভালো মানুষটা।
* ‘এক জন্ম এভাবেই’ হাসান হাফিজের একটি কাব্যগ্রন্থের নাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.