
যেকোনো জলাধার কেবল জীববৈচিত্র্যের আধারই হয় না, পুরো এক জনপদের জীবন, জীবিকা ও সামাজিক ঐতিহ্যেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে। বগুড়ার শেরপুর পৌর শহরের উত্তর পাশে করতোয়া নদীর এক বাঁকে থাকা গোঁসাইয়ের দহ কেবল দেশি মাছের গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থলই ছিল না, এটি ছিল এ এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার পালনেরও স্থান। পলি জমা, দখল, কৃত্রিম বাঁধ ও কচুরিপানার জঙ্গলে মরণাপন্ন এই জলাশয়ের সংবাদটি তাই উদ্বেগজনক। এটি তো কেবল জলাধার শুকিয়ে যাওয়ার খবর নয়, পুরো এক সামাজিক ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার দলিল।
আজ সেই দহে নেই মাছের ঝাঁক, নেই জেলেদের ব্যস্ততা। দহের এই সাম্প্রতিক দশা আরেকটি মৌলিক প্রশ্নও আমাদের সামনে হাজির করেছে: আমরা কি আমাদের ঐতিহ্যবাহী নদী, বিল ও স্থানীয় মৎস্য প্রজাতিকে রক্ষা করতে পারছি? দেশি মাছের প্রাকৃতিক প্রজননস্থল যদি এভাবে হারিয়ে যেতে থাকে, তাহলে এই ক্ষতিই-বা আমরা কীভাবে পূরণ করব? আর ক্ষতি তো কেবল মাছের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না, কেননা এ ধরনের জলাভূমিকে কেন্দ্র করে পুরো এক এলাকার জীবন ও জীবিকা গড়ে ওঠে।
স্থানীয় লোকজনের মুখে দহের বিবর্তনের ইতিকথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি দখল ও ভরাটের কারণে আশির দশক থেকেই রূপ বদলে যেতে থাকে দহের। এ কথা থেকেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের জলাশয়গুলো কীভাবে মানবসৃষ্ট কারণেই আজ ধ্বংসোন্মুখ।
আশার কথা যে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) করতোয়ার পুরোনো গতিপথে খননকাজের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে অতীতে বহুবার দেখা গেছে, কেবল মাটি কেটেই প্রশাসনিক দায়িত্ব শেষ করা হয়, যার ফলে কিছুদিন পর নদী আবার ভরাট হয়ে যায়। গোঁসাইয়ের দহের ক্ষেত্রে এই ভুল করা চলবে না। খননের নকশা করার সময় নদীর প্রাকৃতিক সংযোগ রক্ষা, পাড় তৈরি ও অপসারিত মাটি যাতে আবার সংযোগপথ বন্ধ না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
খননের পাশাপাশি অবৈধ দখল উচ্ছেদ করার দিকেও কর্তৃপক্ষকে মনোযোগ দিতে হবে। আমরা দেখেছি, আবাসের গুণগত মান, পর্যাপ্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন, প্রাকৃতিক খাদ্য ও প্রবাহের নিশ্চয়তা না দিয়ে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগে তড়িঘড়ি করে কিছু মাছের পোনা অবমুক্ত করে ফেলা হয়। কিন্তু কচুরিপানা ও বর্জ্য অপসারণ করে প্রাকৃতিক জলসংযোগ ফিরিয়ে না এনে কেবল তা করলে আখেরে কোনো লাভ হবে না।
এ ধরনের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় অবশ্যই স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। গোঁসাইয়ের দহকে বাঁচাতে কালবিলম্ব না করে বৈজ্ঞানিক ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। এই দহ বাঁচলে বাঁচবে জীববৈচিত্র্য, বাঁচবে জীবিকা ও ঐতিহ্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.