
কবিতা দিয়ে যার সাহিত্যযাত্রার শুরু, সময়ের সঙ্গে সেই পথ বিস্তৃত হয়েছে গবেষণা, সমালোচনা, কথাসাহিত্য, শিশুসাহিত্য, সম্পাদনা, গীতিকবিতা ও শিক্ষকতায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই বহুমাত্রিক ভুবনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন অধ্যাপক ড. শাফিক আফতাব। আজ তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনে ফিরে দেখা যায় কবি ও গবেষক এই সাহিত্যস্রষ্টার দীর্ঘ সৃজনযাত্রা, শিক্ষা, কর্মজীবন ও সাহিত্যকর্ম।
শূন্য দশকে কবিতার মধ্য দিয়ে সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেন ড. শাফিক আফতাব। শুরু থেকেই তাঁর লেখায় ছিল নিরীক্ষার প্রবণতা। প্রেম, প্রকৃতি ও ব্যক্তিমানসের পাশাপাশি বাঙালির জীবন, সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের অন্তর্গত টানাপোড়েন তাঁর কবিতায় জায়গা করে নেয়। সময়ের সঙ্গে তাঁর কাব্যচর্চা আরও পরিণত হয়েছে। ‘এবার ধরা দাও’, ‘উচ্ছ্বাস’, ‘পরিত্যক্ত পদাবলী’, ‘এক বিকেলে’, ‘নিঃসঙ্গ নির্জন’, ‘ভাঙনের শব্দ’, ‘বসন্ত বিষণ্ন সন্ধ্যা’, ‘ধানফুল’, ‘নির্বাচিত সনেট’, ‘হে অন্তজ হে ব্রাত্য’, ‘পরালোক’, ‘ভালোবাসার পদাবলি’, ‘জোছনায় জলবতী রাত’, ‘লিবিডো লিরিক’, ‘মালতিমঙ্গল’, ‘বিচ্ছিন্ন বেদনাগুচ্ছ’ ও ‘মৃতপুরী পৃথিবীর শব’সহ তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীলতার পরিচয় বহন করে।
তবে তাঁর পরিচয় শুধু কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণার ক্ষেত্রেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। বিশেষ করে বাংলা উপন্যাস, নারীচেতনা, শওকত আলীর কথাসাহিত্য, সাহিত্যের রূপতত্ত্ব, রসতত্ত্ব, ছন্দ, অলঙ্কার, মুক্তিযুদ্ধ ও উত্তরবঙ্গের জনজীবন তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘শওকত আলীর উপন্যাস : কলাকৌশল ও বৈশিষ্ট্য’, ‘বাংলা উপন্যাসে নারী : সমাজ পরিপ্রেক্ষিত ও স্বাধিকার চেতনা’, ‘পাঁচ দশকের বাংলা জনপ্রিয় উপন্যাস : প্রেক্ষাপট ও পাঠসমীক্ষা’, ‘শওকত আলীর রাজনৈতিক উপন্যাস : পরিপ্রেক্ষিত ও প্রকরণ’, ‘বাংলাদেশের উপন্যাস : নারীর রূপ ও রূপায়ণ’, ‘বাংলা ভাষার জন্মকথা ও অন্যান্য’, ‘সাহিত্যের রূপ-রীতি’, ‘সাহিত্যতত্ত্ব’, ‘জনপ্রিয় কবিতার ধারা’, ‘উত্তরবঙ্গের উপন্যাস : জনধারা ও সংস্কৃতি’, ‘জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য’ এবং ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : বিষয়বৈচিত্র্য ও শিল্পলোক’সহ তাঁর বহু গবেষণা ও প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
শওকত আলীকে নিয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শওকত আলীর উপন্যাসের বিষয়, শিল্পকৌশল, রাজনৈতিক চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ, উত্তরবঙ্গের জনজীবন এবং কথাসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন তিনি। ফলে একজন সাহিত্যিককে শুধু পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সৃষ্টিকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও নান্দনিক পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন।
ড. শাফিক আফতাবের শিক্ষাজীবনও ছিল নানা বাঁক পেরোনো। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে ধর্মপুর ডি ডি এম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর নাটোর নবাব সিরাজউদ্দৌলা সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন। এ সময় সাহিত্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে একপর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়ে সাহিত্যচর্চাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য করার সিদ্ধান্ত নেন। বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি এবং সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন।
তবে পরিবারের অনুরোধে আবারও শিক্ষাজীবনে ফেরেন। ধর্মপুর আব্দুল জব্বার ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেন। পরে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৯৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি এ (অনার্স) এবং ১৯৯৮ সালে এম এ সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল করেন এবং পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত হন। পাশাপাশি ঢাকা লিবার্টি ল’ কলেজ থেকে এলএলবি প্রথম পর্ব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে তুর্কি ভাষার কোর্সও সম্পন্ন করেছেন।
কর্মজীবনের শুরু সাংবাদিকতা, প্রকাশনা ও শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনার পর বর্তমানে ঢাকার একটি ইউনিভার্সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও ফ্যাকাল্টি হিসেবে অধ্যাপনা করেছেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর আরেকটি পরিচয় তৈরি হয়েছে শ্রেণিকক্ষের বাইরে সাহিত্যচর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে।
কথাসাহিত্যেও রয়েছে তাঁর নিজস্ব পদচিহ্ন। ‘অরণ্যে বালুকাবেলা ও অন্যান্য গল্প’, ‘বাঁকাচাঁদের রাতে’ ও ‘একটি নক্ষত্র নিভে গেছে’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। ‘চন্দ্রদ্বীপের রাজকন্যা’ তাঁর উপন্যাস। শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন ‘ভোমরার বিয়ে’, ‘পরিদের দেশে’ ও ‘শিরোপার মহাকাশ ভ্রমণ’। অর্থাৎ সাহিত্যের পাঠক হিসেবে তিনি শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের কথা ভাবেননি, ছোটদের কল্পনা ও অনুভূতির জগতেও প্রবেশ করেছেন।
বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত রচনাগুলোর সম্পাদনা ও ভূমিকা লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর বড় পরিসরের কাজ রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘দুর্গেশনন্দিনী’; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’, ‘শেষের কবিতা’, ‘চতুরঙ্গ’ ও ‘যোগাযোগ’; শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘দেবদাস’ ও ‘শ্রীকান্ত’; বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’, ‘আরণ্যক’ ও ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘পুতুল নাচের ইতিহাস’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনার সম্পাদনা ও ভূমিকার সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত।
এর পাশাপাশি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সেলিনা হোসেন ও শওকত আলীসহ বিভিন্ন লেখকের নির্বাচিত রচনা, গল্প, উপন্যাস ও রচনাসমগ্র সম্পাদনার কাজও করেছেন তিনি। এই কাজের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে চিরায়ত সাহিত্যকে সহজে পৌঁছে দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন।
ড. শাফিক আফতাবের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক বলে জানা যায়। এত বিপুল সংখ্যক গ্রন্থের মধ্যে কবিতা, গবেষণা, সমালোচনা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, সম্পাদনা ও পাঠ্যভিত্তিক বই যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইতিহাস ও সমাজভিত্তিক রচনাও। ফলে তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তার একক কোনো ঘরানায় আটকে নেই।
গণমাধ্যমেও তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। টেলিভিশন ও বেতারে সাহিত্য ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে ত্রিশের বেশি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। তাঁর কবিতা ও গান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মাধ্যমে আবৃত্তি ও প্রচারিত হয়েছে। বিভিন্ন সাহিত্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত রয়েছেন।
সাহিত্য ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন চে গুয়েভারা সাহিত্য পুরস্কার ও নজরুল সাহিত্য পুরস্কার-২০১৮ এবং মাদার সেরেসা সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯।
ড. শাফিক আফতাবের সাহিত্যজীবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাঁর সৃষ্টির পরিসর যতটা বড়, বিষয়বৈচিত্র্যও ততটাই বিস্তৃত। কবিতায় তিনি অনুভূতির ভাষা খুঁজেছেন, গবেষণায় খুঁজেছেন সাহিত্যের অন্তর্গত নির্মাণ ও সমাজবাস্তবতা, সমালোচনায় খুঁজেছেন পাঠের গভীরতা, আর সম্পাদনায় চিরায়ত সাহিত্যকে নতুন পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
একজন কবির জন্মদিন তাই তাঁর নিজের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি তাঁর পাঠকদের জন্যও ফিরে দেখার একটি উপলক্ষ। ড. শাফিক আফতাবের ক্ষেত্রে সেই ফিরে দেখার জায়গাটি আরও বিস্তৃত। কারণ তাঁর সাহিত্যযাত্রা শুধু একটি বই বা একটি ঘরানার গল্প নয়, এটি কবিতা থেকে গবেষণা, গবেষণা থেকে সম্পাদনা, সম্পাদনা থেকে শিক্ষকতা এবং সেখান থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে নিরন্তর কাজ করে যাওয়ার গল্প।
জন্মদিনে ড. শাফিক আফতাবের প্রতি রইল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তাঁর কলমের এই দীর্ঘ অভিযাত্রা আরও সমৃদ্ধ হোক, বাংলা সাহিত্য ও গবেষণায় তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি আরও বিস্তৃত হোক, নতুন প্রজন্মের পাঠক ও গবেষকদের জন্য তাঁর কাজ হয়ে উঠুক আরও দীর্ঘস্থায়ী এক সাহিত্যিক উত্তরাধিকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.