
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে হবিগঞ্জের খোয়াই নদী। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। গবাদিপশু ও আসবাবপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটছেন বন্যাদুর্গতরা। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে খোয়াই নদীর বানিয়াচং উপজেলার অন্তর্গত রাধাপুর বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে হাওরে ঢুকে পানি।
চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙন আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ভাঙন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এতে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাস পাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনাও রয়েছে হুমকির মুখে। এছাড়া চরম ঝুঁকিতে রয়েছে খোয়াই নদীর মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষা বাঁধ। স্থানীয় বাসিন্দারা দিন-রাত বাঁধ রক্ষায় কাজ করছেন। তারা বাঁশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে।
সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের খোয়াই নদীর কালীগঞ্জে বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার পর দ্রুত বেগে নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাঁও, নতুন বাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণরামপুর, দক্ষিণচর, রামনগর ও বনদক্ষিণ এলাকার একটি অংশসহ ১৫টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। এসব এলাকার অনেক পরিবারের ঘরে কোমরসমান পানি ওঠে। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড় ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে শুরু করেন। নিরাপদ স্থানে যেতে দেখা যায়। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন, আবার অনেকে স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিয়েছেন। এদিকে হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকার কয়েকটি ঘরে পানি প্রবেশ করে।

খোয়াই নদীর কালীগঞ্জ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল হক, হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। পরে স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে মাইকিং করে প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে ও নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়। রাত ১২টার দিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে যায়। অনেক অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সঙ্গে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় পুরো এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। একই সঙ্গে বন্যার আশঙ্কা তৈরী হয়েছে।
রাতে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোয়াই নদীর চুনারুঘাট বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৯২ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে ১১৩ সেন্টিমিটার এবং হবিগঞ্জ শহরের মাছুলিয়া পয়েন্টে ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও রাতের দিকে দিকে পানি কমতে থাকে। তবে জেলার দুটি অংশে বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে জেলার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। বন্যাদুর্গতদের আশ্রয়ণ কেন্দ্রে উঠার জন্য বলা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মঈনুক হক জানান, বন্যার পরিস্থিতি তদারকি করতে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও ১৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। বন্যাদুর্গতদের জন্য ১ হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.