
রাজশাহীর তানোরে বোরো মৌসুমে ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। শ্রমিক সংকট, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বাজারে ধানের অস্বাভাবিক কম দাম—এই তিন সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকসমাজ। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বলছেন, এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি জোগানো সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাজারে চিকন ধান (জিরাশাইল) প্রতি মণ (৪১ কেজি) বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১১০০ থেকে ১১৫০ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় এই দামকে একেবারেই অযৌক্তিক মনে করছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, মিলার ও আড়তদারদের একটি প্রভাবশালী চক্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধানের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। মৌসুমে কম দামে ধান কিনে পরে উচ্চমূল্যে চাল বিক্রি করাই তাদের কৌশল।
এদিকে আড়তদারদের দাবি, জ্বালানি সংকটের কারণে মোকাম থেকে নিয়মিত পরিবহন না আসায় ধানের দাম কমে গেছে। তবে কৃষকদের মতে, এ যুক্তি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
কৃষকরা জানান, বহিরাগত শ্রমিক না আসায় স্থানীয় শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে মজুরি বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। আগে যেখানে একজন শ্রমিককে ১৫ কেজি ধান দিতে হতো, এখন সেখানে ২০ কেজি পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এছাড়া দৈনিক মজুরিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০০ থেকে ১৩০০ টাকায়।
উপজেলার বিলকুমারীসহ বিস্তীর্ণ বিল এলাকায় আগাম বোরো চাষ হয়ে থাকে। চলতি মৌসুমে বিঘাপ্রতি গড়ে ২০ থেকে ২৫ মণ ফলন হলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় আয় কম হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষক রাজিব বলেন, ‘ঋণ করে চাষ করেছি। কিছু ধান ঘরে তুলেছি, কিন্তু বাকি ধান কাটতে পারছি না শ্রমিকের অভাবে। যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে, তাতে ঋণের টাকাও উঠবে না।’
আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, ‘২৪ কাঠা জমির ধান কাটতে ৮ জন শ্রমিক লেগেছে। জনপ্রতি ৭০০ থেকে ১৩০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়েছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির সুযোগ থাকলেও নানা প্রশাসনিক জটিলতা, পরিবহন খরচ এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে তারা সরাসরি সেখানে ধান বিক্রি করতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে আড়তদারদের কাছে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
কৃষক মনোরঞ্জন দাস মুনা বলেন, ‘প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এখন ৪-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে অনেকেই কৃষি ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।’
এ অবস্থায় কৃষকদের দাবি, সরাসরি হাট থেকে সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা চালু করা হোক, যাতে তারা ন্যায্য মূল্য পান এবং লোকসান থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৫০ হেক্টরের ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো এলাকার ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.