
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর দেশে ‘টার্গেট কিলিং’ নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, নির্বাচন বানচাল করতে ষড়যন্ত্রকারীরা প্রশিক্ষিত শুটার নিয়ে মাঠে নেমেছে—এই বক্তব্যের পর বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় আসে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রাণনাশের আশঙ্কায় থাকা বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও উপদেষ্টাকে গানম্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের সাময়িকভাবে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার পরদিন ১৩ ডিসেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে এবং প্রশিক্ষিত শুটার ব্যবহার করছে। ওই বৈঠকে রাজনৈতিক দলের নেতারা জুলাই অভ্যুত্থান নস্যাৎ করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে ঐক্যবদ্ধ থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে গত ১৭ ডিসেম্বর ১৮টি ছাত্র সংগঠন এক যৌথ বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে জানায়, গণহত্যাকারী পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি পরিকল্পিতভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার মিশনে নেমেছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনায় ভারতে অবস্থানরত পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা নীলনকশা তৈরি করেছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও সন্দেহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে শরিফ ওসমান হাদির হত্যার পর অভিযুক্ত শুটারদের নির্বিঘ্নে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো হাদির শুটারদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানানো হয়নি।
সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর জামিনপ্রাপ্ত কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশে চলে যায় এবং সেখান থেকেই টার্গেট কিলিং পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় ফিল্মি কায়দায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন হত্যার পর আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমনের নাম আলোচনায় আসে। মামুন বর্তমানে থাইল্যান্ডে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।
এর সাত দিন পর ১৭ নভেম্বর ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে দোকানে ঢুকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান ওরফে মামুনের নাম উঠে আসে। মামুন বর্তমানে মালয়েশিয়ায় এবং তার ভাই মশিউর ওরফে মশি ভারতে অবস্থান করছে বলে জানা যায়। দুবাইয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও কুমিল্লা কারাগারে আটক সুব্রত বাইনও টার্গেট কিলিং মিশনে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহ করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৫ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন ওরফে বিথীকে। র্যাব-১১ তাকে গ্রেপ্তার করে পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সুব্রত বাইনের সম্পৃক্ততা তদন্তাধীন রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে আরও জানা গেছে, ৫ আগস্টের আগে ‘আয়নাঘরে’ বন্দি থাকা সুব্রত বাইন মুক্তি পেয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন এবং একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সঙ্গেও তার সংযোগ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশকে অস্থিতিশীল করে নির্বাচন বানচালের লক্ষ্যে যৌথ নীলনকশার অংশ হিসেবে তাকে পুনরায় বাংলাদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়। তবে আগেভাগেই বিষয়টি আঁচ করতে সক্ষম হয় দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
গত ২৭ মে কুষ্টিয়া থেকে সুব্রত বাইন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী। পরবর্তীতে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজন শুটারকে গ্রেপ্তার করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, কারাগারে থেকেও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল সুব্রত বাইন। এ কাজে তার মেয়েকেও যুক্ত করা হয় বলে দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে হাদি হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় অন্তত ২০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য প্রার্থী গানম্যান ও আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছেন।
এর আগে ১৫ ডিসেম্বর রাজনৈতিকভাবে ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং রিটেইনার (গানম্যান) নিয়োগের সুযোগ দিয়ে নীতিমালা জারি করে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, টার্গেট কিলিং সফল করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে। হাদি হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যাওয়া শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২৭ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চেকবই ও আর্থিক নথি বিশ্লেষণ করে সিআইডি জানায়, চূড়ান্ত লেনদেন সম্পন্ন না হওয়া রেকর্ডসহ মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ২১৮ কোটি টাকা। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহে কোনো শক্তিশালী নেটওয়ার্ক জড়িত কি না—সে বিষয়ে একাধিক তদন্ত দল কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ অভিযোগ করে বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তি ভারত তাদের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার সব ষড়যন্ত্র ছাত্র ও যুবসমাজ প্রতিহত করবে এবং শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিসেস রোকসানা খানম
অফিস : বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৫বি, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ইমেইল : khoborpratidin.news@gmail.com
Copyright © 2026 খবর প্রতিদিন. All rights reserved.